আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা: ইসলামের দৃষ্টিতে আখেরি চাহার সোম্বা

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 
বিশ্বের অনেক দেশেই আরবি সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার শোম্বা হিসেবে স্মরণ করা হয়,আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা।আজ ২৮ সফর, ০৬ অক্টোবর পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা বা  মহানবী (সা.)-এর রোগমুক্তি দিবস।প্রতিবছর হিজরি সালের সফর মাসের শেষ বুধবার মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্মারক দিবস হিসেবে পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা উদযাপিত হয়।ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে আখেরি চাহার সোম্বা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নবী করিম (সা.) ইন্তেকালের আগে এই দিনে কিছুটা সুস্থতা বোধ করেছিলেন। ফারসিতে দিনটিকে আখেরি চাহার সোম্বা নামে অভিহিত করা হয়।ফারসি শব্দমালা আখেরি চাহার সোম্বা অর্থ শেষ চতুর্থ বুধবার। রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনে শেষবারের মতো রোগমুক্তি লাভ করেন বলে দিনটিকে মুসলমানরা প্রতিবছর শুকরিয়া দিবস  হিসেবে উদযাপন করেন। তাঁরা নফল ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে দিবসটি অতিবাহিত করেন। তাই উম্মতে মুহাম্মদির আধ্যাত্মিক জীবনে আখেরি চাহার সোম্বার গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম।রাসুল (সা.) ১১ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে প্রচলিত রয়েছে যে এক ইহুদি কবিরাজ রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক নিয়ে জাদুটোনা করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করে গোসল করেন এবং দুজন সাহাবির কাঁধে ভর করে মসজিদ-ই-নববীতে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। ফলে সব মুসলমান খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান। সবাই সাধ্যমতো দান-সদকা করেন। শুকরিয়ার নামাজ আদায় ও দোয়া করেন। কেউ কেউ দাস মুক্ত করে দেন। অবশ্য বিকেলেই তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর সুস্থতায় আর উন্নতি হয়নি, তিনি আর গোসলও করেননি। পরে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ইন্তেকাল করেন।
তাই অনেকেই সফর মাসের আখেরি চাহার শোম্বা বা শেষ বুধবারকে ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। বিভিন্ন দরবার শরিফে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। শোকরানা-নফল নামাজ আদায় করা হয়। রোগমুক্তির দোয়া করা হয়। দান-খয়রাত করা হয়। সরকারিভাবে ঐচ্ছিক ছুটি পালন করা হয়। কিন্তু কোরআন, হাদিসের আলোকে আমরা মনে করি এগুলো একেবারেই ভিত্তিহীন। অনুরূপ ভিত্তিহীন ওপরে উল্লিখিত ঘটনা । এর কয়েকটি কারণ আছেঃ-* রাসুল (সা.)-এর ওপর এক ইহুদি জাদু করেছিল। এটা ছিল হোদায়বিয়ার সন্ধির পরে সপ্তম হিজরির মহররম মাসের প্রথম দিকের ঘটনা। এই জাদুর প্রভাব কত দিন ছিল, সে সম্পর্কে দুটি বর্ণনা রয়েছে। এক বর্ণনায় ছয় মাসের কথা এসেছে, অন্য বর্ণনায় এসেছে ৪০ দিনের কথা। তবে যাই হোক, সুস্থতার তারিখ কোনোভাবেই ১১ হিজরির সফর মাসের ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ বা ‘শেষ বুধবার’ হতে পারে না। (ফাতহুল বারি : ১০/২৩৭, আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া : ২/১৫৪, শরহুজ জুরকানি : ৯/৪৪৬-৪৪৭)* রাসুল (সা.)-এর সুস্থতার জন্য যে সাত কুয়া থেকে সাত মশক পানি আনা হয়েছিল এবং সুস্থতার জন্য তাঁর দেহ মোবারককে ধৌত করা হয়েছিল, তা কি বুধবারের ঘটনা না বৃহস্পতিবারের? ইবনে হাজার ও ইবনে কাসির একে বৃহস্পতিবারের ঘটনা বলেছেন। (ফাতহুল বারি : ৭/৭৪৮, কিতাবুল মাগাজি : ৪৪৪২, বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/১৯৩, সীরাতুন নবী, শিবলী নোমানী : ২/১১৩)* . এ তথ্যও সঠিক নয় যে বুধবারের পর রাসুল (সা.) আর গোসল করেননি। কেননা এরপর এক রাতে এশার নামাজের আগে গোসল করার কথা সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। (মুসলিম, হাদিস : ৪১৮, বুখারি, হাদিস : ৬৮১)। আর এ কথাও ঠিক নয় যে বুধবারের পর সুস্থতায় কোনোরূপ উন্নতি হয়নি। বরং এরপর আরেক দিন সুস্থবোধ করেছিলেন এবং জোহরের নামাজে শরিক হয়েছিলেন। (বুখারি , হাদিস : ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১, মুসলিম, হাদিস : ৪১৮) এমনকি সোমবার সকালেও সুস্থবোধ করেছিলেন। যার কারণে হজরত আবু বকর (রা.) অনুমতি নিয়ে নিজ ঘরে চলে গিয়েছিলেন।
(সিরাতে ইবনে ইসহাক পৃ. ৭১১-৭১২, আর রাওজাতুল উলুফ : ৭/৫৪৭-৫৪৮)* . রাসুল (সা.)-এর সুস্থতার কারণে খুশি হওয়া কিংবা তাঁর সুস্থতার সংবাদ পড়ে আনন্দিত হওয়া প্রত্যেক মুমিনের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ কথা দাবি করা প্রমাণহীন যে সাহাবায়ে কেরাম কিংবা পরবর্তী যুগের মনীষীরা সে খুশি প্রকাশের জন্য উপরোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন কিংবা একে উদযাপনের দিবস ঘোষণা করেছেন। এ দাবির সপক্ষে দুর্বলতম কোনো দলিলও বিদ্যমান নেই।* রাসুল (সা.)-এর ওপর অনেক মসিবত এসেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নাজাত দিয়েছেন। তায়েফ ও ওহুদে আহত হয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করেছেন। একবার ঘোড়া থেকে পড়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছেন, যার কারণে মসজিদে যেতে পারেননি।
আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করেছেন। তাঁর সুস্থতা লাভের এসব আনন্দের স্মৃতিগুলোতে দিবস উদযাপনের কোনো নিয়ম আছে? তাহলে আখেরি চাহার শোম্বা যার কোনো ভিত্তি নেই, তা কিভাবে উদযাপনের বিষয় হতে পারে!* কোনো দিনকে বিশেষ ফজিলতের দিবস মনে করা কিংবা বিশেষ কোনো আমল তাতে বিধিবদ্ধ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা কিংবা তাকে ধর্মীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা শরিয়তের বিধানের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, এগুলো ইসলামী শরিয়তের দলিল ছাড়া শুধু মনগড়া যুক্তির ভিত্তিতে তা সাব্যস্ত করা যায় না। এটি শরিয়তের একটি অবিসংবাদিত মূলনীতি। সুতরাং উপরোক্ত তথ্য ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশুদ্ধ হলেও এ দিবসকে ঘিরে ওই সব রসম-রেওয়াজ জারি করার কোনো বৈধতা সাব্যস্ত হয় না,সর্বাবস্থায় কেউ কোনভাবে বলছেন না যে, অসুস্থতা শুরু হওয়ার পরে মাঝে কোনোদিন সুস্থ হয়েছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেই ইন্তেকালের কয়েক দিন আগে তিনি গোসল করেছিলেন বলে সহীহ বুখারীতে আয়েশা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে।
(সহীহ বুখারী – ১/৮৩, ৪/১৬১৪, ৫/২১৬০)এ গোসল করার ঘটনাটি কত তারিখে বা কী বারে ঘটে ছিল, তা হাদিসে কোনো বর্ণনায় সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়নি। তবে আল্লামা ইবনূ হাজার আসকালানী রা. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্যান্য হাদিসের সাথে সমন্বয় করে উল্লেখ করেছেন যে, এ গোসলের ঘটনাটি ঘটেছিল ইন্তেকালের আগের বৃহস্পতিবার। অর্থাৎ ইন্তেকালের ৫ দিন আগে।১২ রবিউল আওয়াল ইন্তেকাল হলে গোসলের ঘটনাটি ঘটেছিল ৮ রবিউল আওয়াল।
উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, সফর মাসের শেষ বুধবার বা আখেরি চাহার শোম্বায় রাসূল সা. এর গোসল দেওয়া, সুস্থ হওয়া, ইমামতি করার ও লোকদের উপদেশ দেওয়া এবং সাহাবীগণ আনন্দিত হয়ে দান সদাকাহ করার কাহিনীর কোনরূপ ভিত্তি নেই।।পরিশেষে…সফর মাসকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ইবাদাত নয় বরং আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট সব দিন-রাত-মাসের ইবাদাত-বন্দেগি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ; সেহেতু দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ লাভে এবং উভয় জগতের সকল অপকারিতে ও অকল্যাণ থেকে মুক্ত থাকতে নফল নামাজ, আইয়ামের বিজের রোজা পালন এবং দান-সাদকায় আত্মনিয়োগ করা জরুরি।আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে নেক আমলের প্রতি মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি অন্যায় কাজ থেকে ফিরে থাকার তাওফিক দান করুন।
লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য 
প্রতিষ্ঠাতা,বাংলাদেশ রোগী কল্যাণ সোসাইটি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *