আজ বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস আজ শুক্রবার  ০৩ ডিসেম্বর ২০২১. জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসটি ১৯৯২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে।শারীরিকভাবে অসম্পূর্ণ মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতা প্রদর্শন ও তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই দিবসটির সূচনা হয়।প্রতিবন্ধী মানুষের রয়েছে নানা রকম প্রকারভেদ।শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী,বাক প্রতিবন্ধী,বুদ্ধি প্রতিবন্ধী,এমন কি বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে বয়স, লিঙ্গ, জাতি,সংস্কৃতি বা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী এই মানুষ গুলো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে জীবন যুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধা হিসেবে জীবনকে পরিচালনা করছে।দুঃখ জনক হলেও এটাই চুরান্ত বাস্তবতা যে, প্রতিবন্ধী মানুষের  জীবনে  রয়েছে পদে পদে বাধা। এরা পৃথিবীর রং, রূপ ও রসের বিলাস-বৈচিত্র্যের বৃত্ত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। স্বাভাবিক মানুষের ন্যায় সুন্দর এই জীবনটাকে যথাযথ ভাবে  উপভোগে বরাবরই  অক্ষম। দিকে দিকে যে বিচিত্র কর্মধারা নিত্যপ্রবাহিত, সেখানে যোগদানের ক্ষেত্রেও  তারা প্রতিনিয়ত অবহেলিত ও নানা প্রকার প্রতিবন্ধকতার শিকার। ফলে ধীরে ধীরে এদের জীবনে আসে হতাশা। অদৃশ্য শিকলে হাতদুটো যেন বাঁধা পরে যায় অজান্তেই।  অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় সর্বদিক ।
২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে এ আইনটি বাতিল করে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ প্রবর্তন করা হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের সুরক্ষা প্রদানের অনন্য দলিল।তাছাড়াও, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫, ১৭, ২০ এবং ২৯ অনুচ্ছেদে অন্যান্য নাগরিকদের সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমসুযোগ ও অধিকার প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রশ্ন থেকে যায় আজও কি অন্যান্য নাগরিকদের সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমসুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত হয়েছে?গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের  সমাজসেবা অধিদফতর এর সর্বশেষ হাল-নাগাদ তথ্য অনুসারে জানা যায়,সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ দায়-দায়িত্বের অংশ হিসেবে ২০০৫-০৬ অর্থ বছর হতে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচি প্রবর্তন করা হয়। শুরুতে ১,০৪,১৬৬ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জনপ্রতি মাসিক ২০০ টাকা হারে ভাতা প্রদানের আওতায় আনা হয়।
২০০৮-০৯ অর্থ বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ জন এবং জনপ্রতি মাসিক ভাতার হার ২৫০ হিসেবে বার্ষিক বরাদ্দ ছিল ৬০.০০ কোটি টাকা।২০০৯-১০ অর্থ বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৬০ হাজার জনে, মাসিক ভাতার হার ৩০০ টাকায় এবং বার্ষিক বরাদ্দ ৯৩.৬০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।২০১০-১১ অর্থ বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৮৬ হাজার জনে উন্নীত করা হয় এবং মাথাপিছু মাসিক ভাতা ৩০০ টাকা  হিসেবে বার্ষিক বরাদ্দ ১০২.৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৮ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মাসিক ৭৫০ টাকা হিসেবে ১৬২০ কোটি টাকা প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন যে থেকেই যায়, এই অর্থ কি একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য যথেষ্ট? অবশ্যই যথেষ্ট নয়। তাই বলি, একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে কেবল প্রতিবন্ধী হিসেবে অনুগ্রহ নয় দিতে হবে মানুষ হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান।প্রতিবন্ধীদের যদি মানুষ হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান ও সমঅধিকার ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা যায় তাহলে তারা দেশ ও জাতীর জন্য বয়ে আনতে পারে অকল্পনীয় সম্ভাবনাময় অর্জন । তাদের  অনেকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসাধারণ  প্রতিভা। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো  সম্ভব।অথচ সময়মতো চিকিৎসা পেলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা ভালো হয়ে যায় আর সম্পূর্ণ ভালো না হলেও সমাজে উপার্জনক্ষম হয়ে বেঁচে থাকতে পারে।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার তিনটি লক্ষণ
প্রথমত, এদের বুদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় কম থাকে। ওয়েক্সলার ইন্টেলিজেন্স স্কেল অনুযায়ী এদের আইকিউ ৭০ বা তার কম থাকে।দ্বিতীয়ত, জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার দক্ষতার ক্ষেত্রে এ শিশুদের যথেষ্ট ঘাটতি থাকে।তৃতীয়ত, ব্যক্তির মানসিক প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি তার ১৮ বছর বয়সের আগেই দৃশ্যমান হয়।
বেশির ভাগ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুকে প্রথম দর্শনে বোঝা যায় না যে, তাদের কোনো সমস্যা আছে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের বিকাশ একটু দেরিতে হয়। তারা দেরিতে কথা বলতে শিখে, তাদের স্মৃতিশক্তি কম থাকে, মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা ও ধৈর্য কম থাকে, কোনো কিছু শিখার ক্ষমতাও কম থাকে। যেমন_ অন্য বাচ্চারা হয়তো দিব্যি টয়লেট করে পরিচ্ছন্ন হয়ে বের হচ্ছে।সাধারণ মানুষের আইকিউ গড়ে ৯০-১০০ এর মধ্যে থাকে। প্রতিবন্ধীদের পরিমাপক মাত্রা বেশ কম থাকে। মৃদু মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের বুদ্ধির একক বা আইকিউ স্কোর থাকে ৫০ থেকে ৬৯ এর মধ্যে। এরা সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়তে পারে। তবে তারা পরীক্ষায় সচরাচর খারাপ করে। মধ্যম মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের বুদ্ধাঙ্ক বা আইকিউ ৩৫-৪৯ এর মধ্যে থাকে। এই স্তরের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের অনেক অল্প বয়সেই বোঝা যায়। তাদের ভাষার বিকাশ দেরিতে হয়, এদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ও সমাজে চলার জন্য প্রচুর সহযোগিতা দরকার হয়। তাদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে স্পেশাল এডুকেশন টিচারদের তত্ত্বাবধানে শিখালে ভালো ফল পাওয়া যায়।
কারণ : এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার কারণ জানা যায় না। বিভিন্ন রোগের প্রভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা হতে পারে। ডাউন্স সিন্ড্রোম, ভেলোকেরিওফেসিয়াল সিন্ড্রোম এবং ফেটাল অ্যালকোহল সিন্ড্রোম জন্মগত বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। কখনও কখনও পিতা-মাতার থেকে প্রাপ্ত অস্বাভাবিক জিন বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার কারণ হিসেবে কাজ করে।গর্ভাবস্থার সমস্যার জন্য বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা হতে পারে। আবার জন্মকালীন সমস্যার কারণেও বুদ্ধি প্রতবন্ধিতা হতে পারে। কিছু রোগ ও বিষাক্ততার প্রভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা হতে পারে। যেমন_ হুপিং কাশি, মিজলস, মেনিনজাইটিস রোগের সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা হতে পারে। সিসা বা লিড, মারকারি ইত্যাদি বিষাক্ততার শিকার হয়েও বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা হতে পারে। আয়োডিনের ঘাটতির কারণে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হতে পারে। অপুষ্টির কারণেও এটি হতে পারে।বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার জন্য যেসব রোগ ও সংক্রমণ দায়ী সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা বিশেষভাবে দরকার।
 হোমিও সমাধানঃ
পরিশেষে প্রতিবন্ধী  শিশুদের পিতা-মাতার প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন কালবিলম্ব না করে তাদের সন্তানকে কোন হোমিও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসাধীনে ন্যস্ত করেন,হোমিওপ্যাথি হলো  একটি জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি, এই পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং সম্পূর্ণ উপসর্গের উপর ভিওি করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়,সব লক্ষণ এবং উপসর্গ মুছে ফেলে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যের ফিরে যাবার একমাএ উপায় এটি হোমিওপ্যাথির উদ্দেশ্য প্রতিবন্ধী  রোগীর অন্তনিহিত কারণ এবং ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা মোকাবেলার মাধ্যমে আরোগ্য করা,রোগের কারণ অনুভূতি ব্যক্তিস্বাতন্ত এবং হ্রাস বৃদ্ধির উপর ভিওি করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়, আর সঠিক ভাবে নির্বাচন করতে পারলে তাহলে আল্লাহর রহমতে হোমিওপ্যাথিতে প্রতিবন্ধী রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব।
লেখক,
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য
প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *