আম্মুর কাছে খোলা চিঠি …. 

প্রিয় আম্মুঃ 
কেমন আছেন আপনি? ভালো আছেন তো? আমি ভালো নেই। আমাকে কেউ আর এখন প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে না “কি করছিস? কি খেয়েছিস?” কেউ এখন আর বলে না “একটু ঘন দুধ দিয়ে চা বানিয়ে খা। দেখবি অনেক ভালো লাগবে।” আমার গলার স্বর শুনে কেউ এখন আর বুঝে না, আমি কষ্টে আছি, নাকি আমার শরীর খারাপ, নাকি আমি না খেয়ে ঘুমিয়ে গেছি। আচ্ছা আম্মু, আপনি কি করে এসব বুঝতেন?
আচ্ছা আম্মু,  আমাদের কথা কি আপনার মনে পড়ে? আব্বুর কথা, আমার কথা,  আজিম-শারমিন- আলিম-নিশির কথা? আপনাকে দেখিনি আজ এক বছর হয়ে গেছে। এই এক বছর আমার কাছে এক যুগের চেয়েও বেশি মনে হয়েছে। কতদিন আপনাকে ডেকেছি! জোরে জোরে ডেকেছি। এক রুম থেকে অন্য রুমে হেঁটে হেঁটে ডেকেছি। দেওয়ালের দিকে, ছাদের দিকে, যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে তাকিয়ে আপনাকে ডেকে ডেকে কেঁদেছি। আমার ডাক কি আপনি শুনতে পেয়েছেন? যখন‌ই মন খারাপ হয় তখন‌ই আপনাকে ডাকি – মা, মা, ও মা, ও আম্মি, আম্মিজান,  আম্মাজান, মা জননী, মা রে! কত ভাবে ডাকি আমি তবুও আপনার কোনো সাড়া পাই না। আম্মু, আপনি এত চুপ করে আছেন কেন?
আম্মাজান, জানেন, গত এক বছরে অনেএএএএক কথা জমে আছে। আপনাকে সে কথাগুলো বলার জন্য আমি মুখিয়ে আছি। কারো সাথে আমি সে কথাগুলো শেয়ার করতে পারি না। মাঝে মাঝে আব্বুর সাথে কিছু কিছু শেয়ার করি। কিন্তু আপনার অপূর্ণতা রয়েই গেছে।
আম্মু, আপনার কি মনে আছে ইন্ডিয়াতে আমার যখন অপারেশন করা হচ্ছিল তখনকার কথা। আমাকে সকাল আট টায় ওটি-তে ঢুকানো হলো, বিকেল পাঁচটায় বের করা হলো। পরে শুনলাম, এই আট ঘন্টা আপনি ওটির বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক গ্লাস পানি খাওয়ার জন্য‌ও আপনি কোথাও যাননি। আচ্ছা মা, আপনার কি তখন কোনো ক্ষুধা তৃষ্ণা লাগেনি? আপনি কিভাবে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন? আপনার কি পায়ে একটুও ব্যথা করেনি? আবু মামা নাকি আপনার জন্য খাবার ও পানি নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আপনি সেগুলো খাননি। কারণ খেতে হলে আপনাকে অন্য রুমে গিয়ে খেতে হবে। আপনি কেন সেদিন এরকম করেছিলেন? না খেয়ে একটা মানুষ এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? জীবনে আমার জন্য অনেক কষ্ট করে গেছেন। সে তুলনায় আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারিনি ।
আম্মু, আপনার কি মনে আছে, একদিন আপনি আমাকে খাগড়াছড়ির বাসে তুলে দিতে গিয়েছিলেন! সেদিন ভোরে আমি যখন রেডি হয়ে বের হবো তখন আপনি বললেন, “দাঁড়া, আমি তোকে স্টেশনে দিয়ে আসবো।” আমি বললাম, “লাগবে না। আমি একাই যেতে পারবো। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।” আপনি  আমার কথা শুনলেন না। আমার সাথে অক্সিজেনের মোড়ে গেলেন। সেখানে বাসের টিকেট কাটার পর আমি আপনাকে বললাম বাসায় চলে যেতে। কিন্তু আপনি তাও গেলেন না। বললেন, “তোকে বাসে তুলে দিয়ে যাই।” পরে আমি যখন বাসে উঠলাম তখন আপনিও আমার সাথে সাথে বাসে উঠলেন। আমি কোন সিটে বসি সেটা দেখলেন। আমি হঠাৎ দেখি আপনার চোখ ছলছল করছে। জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে। আপনি কিছু হয়নি বলে আমার মাথায় ও গায়ে হাত বুলিয়ে নেমে গেলেন। আপনি কিছুই বলেন নি। সারা রাস্তায় আমি ভাবছিলাম কি হয়েছিলো। যাক,  সে সপ্তাহ শেষ করে আমি আর যেতে পারি নি চট্টগ্রামে। কারণ, তখন একটা পরীক্ষা কমিটিতে কাজ করছিলাম। টানা এক মাস কলেজের কাজে খাগড়াছড়িতে রয়ে গেছি।
এরপর যেদিন যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি সেদিন শুনলাম আমার ট্রান্সফার হয়েছে চট্টগ্রামে। কলেজ থেকে রিলিজ নিয়ে যখন চট্টগ্রামে এলাম তখন আপনার চোখ মুখে খুশির ঝলক। সেদিন আপনি আমাকে বললেন, “তোকে যেদিন গাড়িতে তুলে দেই সেদিন আমার খুব কষ্ট হয়েছে। আমি শুধু ভাবছি এত বাজে গাড়িতে করে আমার মেয়ে প্রতি সপ্তাহে journey করে কিভাবে? সেদিন থেকে আল্লাহ্কে ডেকে শুধু বলেছি তোর যেন চট্টগ্রামে ট্রান্সফার হয় । মহান আল্লাহ্ পাক আমার কথা শুনেছেন। এজন্য শুকরিয়া আল্লাহ্ পাকের দরবারে।” মায়ের দোয়া যে কত শক্তিশালী হয় সেদিন আরেকবারের মতো বুঝলাম । আচ্ছা মা, আপনি কি এখনও আমার জন্য দোয়া করেন? খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনি কি করেন? জানতে পারি না, জানার কোনো উপায় নেই। এজন্য শুধু কাঁদি  আর মহান আল্লাহ্ পাকের দরবারে ফরিয়াদ করি তিনি যেন আপনাকে বেহেস্তে স্থান দেন।
মা, ইদানীং আমার খুব কান্না পায়। ইদানীং আপনাকে খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। মামুন মারা যাওয়ার পর আমি আপনাকে জড়িয়ে ধরলে আপনি যেরকম শক্তভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, মনে হচ্ছিল আমার সমস্ত দুঃখ কষ্ট আপনি আপনার বুকের ভিতর টেনে নিচ্ছিলেন, সেরকমভাবে আপনাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরতে চাই। মা গো, শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা?
আম্মাজান, আজ আর বেশি কথা বলবো না। আমার কথা কখনো ফুরাবে না।  আপনি ভালো থাকেন ওপারে। শুধু একটু যদি বলতেন, আপনি কেমন আছেন? – তাহলে মনে শান্তি পেতাম। মা, ওমা, মা গো  ভালো থাকেন মহান আল্লাহ্ পাকের কাছে।
ইতি
জনমদুখিনী আপনার বড় মেয়ে (নিগার সুলতানা)
সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *