আল-কুরআন ও কোভিড-১৯: মহামারি বিষয়ক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

আলকুরআন মহান প্রভূর দেওয়া এক অনবদ্য হেদায়েতের গ্রন্থ। এটি সম্পূর্ণ নির্ভুল, চিরন্তন ও শাশ্বত এক বিধান। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, আলকুরআন তার কালকে ব্যাখ্যা করে অর্থাৎ প্রত্যেক যুগের প্রতিটি বিষয়েই কুরআনের কাছে পথনির্দেশ রয়েছে। কুরআনের সাধারণ একজন পাঠক হিসাবে আমি কুরআনের আলোকে করোনা মহামারি ও পৃথিবীতে অন্যান্য আপতিত বিপদ, রোগ- ব্যাধি ও মানুষের উপর বিভিন্ন সময়ে খোদায়ী গযবকে সংক্ষেপে আলোচ্য নিবন্ধে উপস্থাপন করা হলো-

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী পৃথিবীতে যে সকল বিপদ-মুসিবত মানুষের সমাজে আসে, তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। মানুষকে কষ্ট ও শাস্তি দেওয়া সৃষ্টিকর্তার লক্ষ নয়;বরং সাময়িক এ সমস্ত বালা-মুসিবতের মাধ্যমে মানুষ যেনো তার আত্মসমালোচনা করতে পারে, দুনিয়াবী মিথ্যা হাতছানি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে ও ধীরে ধীরে ঢুবে যাওয়া অন্ধকারের গহবর থেকে আলোর পথে ফিরে আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমরা তোমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করবো, কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা।

আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে।’ (২:১৫৫) মানুষের সীমাহীন বাড়াবাড়ি এবং সীমালংঘনের মাত্রা অধিক পরিমাণ ছাড়িয়ে গেলে এ সকল পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ দেন। এ প্রসঙ্গে আলকুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; ফলে তিনি তাদেরকে তাদের কোনো কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসেন।’ (৩০:৪১) এ ভাবে মানুষকে স্রষ্টার পথে ফিরিয়ে আনার স্রষ্টা কর্তৃক এ নিয়ম পবিত্র কুরআনে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যমীনে এবং তোমাদের ওপর এমন কোনো বিপদ আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিখে রাখি না। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ।’ (সূরা হাদীদ ৫৭:২২) আল্লাহ তায়ালা বিপদ-মুসিবত দিয়ে মানুষের মর্যাদাও বৃদ্ধি করেন। মানুষকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেন। আর সংশোধন না হলে আযাব দিয়ে তাদের ধ্বংসও করেন।

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন জাতিকে বিভিন্ন আযাব দিয়ে ধ্বংস করার বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন: আল্লাহ নূহ (আঃ) এর উম্মতকে প্লাবন দিয়ে ধ্বংস করেন। তিনি ৫০ জেনারেশনকে মহান আল্লাহর প্রতি ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েছেন। বংশ পরম্পরায় তার জনপদের অধিবাসীরা দাওয়াত থেকে মুখ
ফিরিয়ে নিয়ে স্রষ্টার প্রতি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে। ফলশ্রুতিতে তাদের জন্য শাস্তি দেওয়া অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো।

কুরআন জানায়-‘আর ডুবিয়ে দিলাম তাদেরকে যারা মিথ্যা আরোপ করেছিল আমার আয়াতগুলোর প্রতি। মুলতঃ তারা ছিল একটি অন্ধ কওম।’ (৭:৬৪) নূহ (আ.) এর সম্্রদায়ের প্রতি প্রেরিত নূহ নবী ও তাঁর দাওয়াতি বর্ণনা নিয়ে সূরা নূহ পবিত্র কুরআনে রয়েছে।আল্লাহ আদ জাতিকে ধ্বংস করেন ভূমিকম্প দিয়ে। কুরআন জানায়-‘তারপর তাদের পাকড়াও করে এক প্রচন্ড ভূমিকম্প। ফলে তাদের সকাল হয় নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায়।’ (৭:৭৮) আল্লাহ লুত (আঃ) -এঁর সমকামি জাতিকে ধ্বংস করেন পাথরবৃষ্টি দিয়ে। ভয়াবহ ইতরতা,নিকৃষ্টতা ও নির্লজ্জতা সেই সমাজে এমন ছিলো যে, তারা নিজেদের অপকর্মকে দোষ মনে করতো না এবং প্রকাশ্যে গর্বের সাথে তা চরিতার্থ করতো। কুরআনে এসেছে –‘(আর স্মরণ করুন লুতের ঘটনা) আমি লুতকে পাঠিয়েছিলাম, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, তোমরা কুকর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরাতো কামতৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন করো, তোমরাতো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।’ (৮০:৮১)

নবীর বাণী অগ্রাহ্য করে তাদের গর্ব-অহংকারে বুদ হয়ে পাপকর্মে নিমজ্জিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে অবশেষে শাস্তি এলো। কুরআনের বর্ণনায়- ‘আর তাদের
ওপর আমরা পাথরবর্ষণ করেছিলাম ভীষণ বর্ষণ। অতএব দেখো, অপরাধীদের পরিণতি কেমন ছিল।’(৭: ৮৪)আল্লাহ সামুদ জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন বিকট শব্দ দিয়ে। কুরআনের কথায়-‘আর যারা যুলুম করেছিলো তাদের পাকড়াও করলো এক বিকট শব্দ। ফলে তারা তাদের ঘরে ঘরে উপুড় হয়ে পড়েছিল।’ (১১: ৬৭) অর্থাৎ ঐ পাপিষ্টদেরকে এক ভয়ঙ্কর গর্জন এসে পাকড়াও করলো। এ ছিলো জিবরীল (আ.) এর গর্জন। হাজার হাজার বজ্রধ্বনির সম্মিলিত প্রাণ কাঁপানো ভয়াবহ গর্জন সহ্য করার ক্ষমতা মানুষ বা কোনো জীব জন্তুর ছিলোনা। ফলে সকলে মৃত্যুবরণ করেছিলো।

অপর দিকে সূরা আরাফের ৭৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘অতঃপর ভমিকম্প তাদেরকে পকড়াও করলো।’ এতে বুঝা যায় যে, ভূমিকম্পের ফলে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। অর্থাৎ ভূকম্পন ও ভয়াবহ গর্জনে তারা ধ্বংস হয়েছিলো।এভাবে মোট ১৪টি জাতি বা গোষ্ঠীকে ধ্বংসের কথা কুরআনে এসেছে। উপরে উল্লেখিত নূহ (আঃ) ও লুত (আঃ)-এর কওম, এবং আদ ও সামুদ ছাড়া অন্য কওমগুলো হলো: ফেরাউন, সাবা, তুব্বা, আইকা, উখদুদ, আসহাবে কাহাফদের কওম, আসহাবুস সাবত, আসহাবুল কারিয়া, আসহাবুর রাস, আসহাবুল ফিল প্রভৃতি।

করোনা ভাইরাসকে আসলে এ সব আযাবের সাথে তুলনা করা যায় না। ঐ আযাবগুলো ছিলো নির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠীর উপর। আর আজকের গ্লোবালাইজেশনের যুগে কোভিড-19 ও নির্দিষ্ট চীনের উহান প্রদেশে না থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। আর তাছাড়া করোনা ভাইরাসের কারণে কোনো
জনগোষ্ঠী পুরোপুরি ধ্বংস হবে না। লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাবে, চরম অর্থনৈতিক মন্দা আসবে, কর্মহীন হয়ে পড়বে দেশে দেশে লাখ লাখ মানুষ ও দারিদ্রতার সীমা আরো বেড়ে যাবে। তাহলে করোনা আযাবটা কেমন আযাব ?আমরা জানি, ফেরাউনকে নীলনদে ডুবানোর আগে বহুদিন ধরে অনেক আযাব এসেছিল। করোনাকে ওই ধরণের আযাবগুলোর সাথে তুলনা করা যায়। আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন-‘আমরা ফেরাউনের অনুসারীদের কয়েকবছর ধরে দুর্ভিক্ষ আর ফসলহানির মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছি যাতে তারা উপলব্ধি করে।’ (৭:১৩০) না, তাদের উপলব্ধি হয়নি। অবশেষে আরো শাস্তি আসতে থাকলো।

আল্লাহ বলেন, ‘আমরা তাদের প্রতি পাঠিয়েছিলাম প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, এবং রক্ত। এগুলো ছিল বিস্তারিত ও স্পষ্ট নিদর্শন। কিন্তু তারা অহংকার করেছিল। আসলে তারা ছিল এক অপরাধী কওম।’ (সুরা আল আরাফ :১৩৩)

কুরআনে নবীগণের মধ্যে মূসা (আঃ)-এঁর কাহিনী সবচেয়ে বেশি বর্ণিত হয়েছে। এর কারণ সম্পর্কে অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে। অনেকের মতে দুনিয়াতে যত স্বৈরাচার এসেছে তার মধ্যে ফেরাউন ছিল সবচেয়ে বড়। বলা যায়, ফেরাউন হলো তাগুতের স্টার-মডেল। পক্ষান্তরে, যত নবী এসেছেন তার মধ্যে মুসা (আঃ)-এঁর সীমাবদ্ধতা ছিল সবচেয়ে বেশি। সব নবী বংশমর্যাদার দিক দিয়ে উচ্চে ছিলেন। মূসা (আঃ) নির্যাতিত বংশে জন্মেছিলেন। তার কোনো সামাজিক অবস্থান ছিল না, তিনি ছিলেন খানিকটা বাক-প্রতিবন্ধী (তোত্লা), কথা আটকে যেতো। মূসা (আঃ) একজন কিবতী (ফেরাউনের কওমের নাম) কে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। সর্বোপরি মূসা (আঃ) ফেরাউন-এর ঘরে লালিত- পালিত হওয়ার দায়বদ্ধতায় ছিলেন। আল্লাহ বারবার মূসা (আঃ)-এঁর কাহিনী বলার মাধ্যমে আমাদের এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেন যে, তোমাদের প্রতিপক্ষ ফেরাউনের চেয়ে শক্তিশালী নয়, আর তোমাদের
সীমাবদ্ধতা মূসা (আঃ)-এঁর চেয়ে বেশি নয়।

ফেরাউন বনী ইসরাইলীদের রাজনৈতিক দাসে পরিণত করে রেখেছিল। বর্তমানে ফিলিস্তিনে আরব মুসলিম, চীনে উইঘুর মুসলিম, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম, ভারতে কাশ্মীরের মুসলিম, রাশিয়ায় চেচনিয়ার মুসলিম, প্রভৃতির যে অবস্থা ঐরকম। ফেরাউন এর সাথে মূসা (আঃ)-এঁর সংগ্রাম ছিল
মূলতঃ বনী ইসরাঈলীদের দীর্ঘমেয়াদি মুক্তিযুদ্ধ। ফেরাউনী তাগুতের কবল থেকে বনী ইসরাইলীদের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসকে আল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এতে মুমিনদের জন্য রয়েছে বিশেষ শিক্ষা। প্রকৃত সত্য আল্লাহই ভালো জানেন।

মূসা (আঃ) এর কাহিনীতে আল্লাহ তাগুতের তিন চরিত্রকে সামনে এনেছেন:
১. ফেরাউন: রাজনৈতিক শক্তি
২. হামান: সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি
৩. কারুন: অর্থনৈতিক শক্তি।

এই তিনশক্তির সিন্ডকেট মূসা (আঃ)-এঁর কওমকে রাজনৈতিক দাসে পরিণত করেছিল। আজও পৃথিবীর সকল মানুষ পুজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের দাসে পরিণত হয়েছে। সকল রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি একত্র হয়ে মানুষকে গোলামে পরিণত করেছে। কারুন মূসা (আঃ)-এর বংশের লোক
হয়েও ফেরাউনের সহযোগী হয়েছিল। বর্তমানেও সম্পদশালী মুসলিম দেশগুলো পুজিবাদী সাম্রাজ্যবাদেরই সহযোগী। তারা বহু ক্ষেত্রে সাম্রজ্যবাদের এজেন্ট হয়ে কাজ করে থাকে।এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, আল্লাহ ফেরাউনকে কীভাবে পরাজিত করলেন ?

আল্লাহ একটার পর একটা দুর্যোগ পাঠালেন। বারবার ফেরাউনের অসহায়ত্ব প্রমাণ হলো। মূসা (আঃ)শক্তিশালী হলেন। প্রতিটি দুর্যোগে মূসা (আঃ) ফেরাউনের সম্প্রদায়ের জন্য দুআ করেছেন, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মূসা (আঃ)-এঁর প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে।রসূল (সাঃ)-এঁর জীবনেও আমরা একই দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। হিজরতের পর মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, রাসূল (সাঃ) কুরাইশদের খাদ্য সহায়তা দেন। তিনি আবু সুফিয়ানকে নগদ পাঁচশত স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়েছিলেন।ফেরাউন সম্প্রদায় দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নেয়নি। বরং প্রতিটি দুর্যোগের পর আবার বিদ্রোহী হয়েছে।

কুরআন বলছে:
‘যখনই আমরা তাদেরকে তাদের জন্য নির্ধারিত কোনো আযাব একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরিয়ে দিয়েছি, তখনই তারা তাদের প্রতিশ্রæতি ভঙ্গ করেছে।’ (আল আরাফ:১৩৫)আমরা যদি নিকট অতীতে তাকাই তাহলে দেখবো, করোনা ভারাসই পৃথিবীতে আসা একমাত্র প্রথম গযব বা মহামারি নয়, বিশ্বকে কাঁপিয়েছে নিকট অতীতে অনেক ভাইরাস ! জাপানের গুটিবসন্ত

অষ্টম শতাব্দীতে ভ্যারিওলা ভাইরাসের কারণে জাপানে যে গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাব হয়, তাকে ধরা হয় ইতিহাসের প্রথম গুটিবসন্তের মহামারি হিসেবে। বলা হয়ে থাকে, জাপানের মোট জনসংখ্যার ৩৩ থেকে ৬০ শতাংশ সেই মহামারিতে মারা যায়। ৭৩৫ সাল থেকে ৭৩৭ সাল পর্যন্ত চলা ওই মহামারিতে মারা
যায় ২০ থেকে ৩৫ লাখ জাপানি, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু।

স্প্যানিশ ফ্লু

মৃতের সংখ্যার হিসাবে আধুনিক যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি হচ্ছে ১৯১৮ সালে ধরা পড়া স্প্যানিশ ফ্লুর প্রাদুর্ভাব। প্রথম মহাযুদ্ধে যেখানে পাঁচ বছরে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, সেখানে স্প্যানিশ ফ্লুতে মাত্র দুই বছরে মারা যায় ২ কোটি মানুষ। স্প্যানিশ ফ্লুর
কারণ ছিল এইচ১এন১ ভাইরাস। স্প্যানিশ ফ্লু যখন মহামারিতে রূপ নেয়, তখন বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম সেই সংবাদ প্রচারে বাধা-নিষেধ আরোপ করলেও স্পেনের মিডিয়া ফলাও করে এই ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের কথা প্রচার করেছিল। তাই এই মহামারির নাম হয়ে যায় স্প্যানিশ ফ্লু, যদিও এর প্রভাব ছিল পুরো ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা জুড়েই।

এশীয় ফ্লু

প্রায় ২০ লাখ মানুষের প্রাণ হন্তারক হিসেবে ১৯৫৭ সালে চীনে আবির্ভূত হয় ভাইরাস এইচ২এন২।প্রাথমিকভাবে এই মহামারি চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুরে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হিউম্যান ইনফ্লুয়েঞ্জার একধরনের মিশ্র জাতের স্ট্রেইন থেকে এই ভাইরাসের উদ্ভব বলে জানা যায়। তবে দ্রুতই এই ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার ও তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হওয়ায় এক বছরের মাথায় কমে আসে এর প্রাদুর্ভাব।

হংকং ফ্লু

এইচ৩এন২ ভাইরাসের প্রভাবে ১৯৬৮ সালে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় হংকং ফ্লুর। হংকংয়ে প্রথম ধরা পড়ায় এই ফ্লুর নাম হয়ে যায় হংকং ফ্লু। তবে দ্রুতই এই ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশেও। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে এই ফ্লুর কারণে পৃথিবীব্যাপী প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়।

এইচআইভি এইডস

হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস, সংক্ষেপে এইচআইভি। মূলত দুই জাতের লেন্টিভাইরাস, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এইচআইভির সংক্রমণে এইডস রোগ হয়।এইডস রোগাক্রান্ত মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একপর্যায়ে এতটা হ্রাস পায় যে তার শরীর কোনো রোগ বা সংক্রমণের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়তে পারে না, ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুই হয়ে যায় তার একমাত্র পরিণতি। ১৯৬০-এর দশকে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় চার কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে এইডস।

আজ পৃথিবীতে কোথাও পঙ্গপাল, কোথাও দাবানল, কোথাও সুনামী, কোথাও টাইফুন, কোথাও উষ্ণতা, কোথাও ভাইরাস। সার্স, ইবোলা, জিকা, সোয়াইন, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, এইডস, প্রভৃতি হরেক ভাইরাস কোনোটাতেই আল্লাহর আশ্রয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি মানুষ। কেবলই এগুলোর সাথে যুদ্ধের হুংকার দিয়েছে। এ সব মোকাবেলা করবে- এই মর্মে ঘোষনা দিয়েছে সবাই। প্রকৃতিতে এ সমস্ত আযা-গযব কেনো আসছে, নিজেদের কর্মকাণ্ডে কোথায় ভুল আছে, এমন আত্মজিজ্ঞাসা কখনো শাসকশ্রেণি করে না। শুধু তাই নয়, স্রষ্টার নাম পর্যন্ত উল্লেখ করে না কথা বার্তায়।

গোমরাহীর এক প্রান্তসীমায় যেনো উপনীত বনি আদম। সূরা আসরে বলা হয়েছে,‘ সময়ের শপথ, নিশ্চয় মানুষ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলরা ছাড়া, যারা সত্যের উপদশে দেয় এবং এত ধৈর্য ধারন করে থাকে’। (সূরা আসর) সুতরাং ভাবনার অনেক বিষয় আছে এখানে।
আজও আমরা দেখছি অধিকাংশ মানুষিএ আযাব-গযব থেকে কোনো শিক্ষা নিচ্ছে না। দেশে দেশে সমকামিতা আইনসিদ্ধ হয়েছে। লুন্ঠন, শোষণ, বিতাড়ন, অপহরণ, খুন,গুম, ধর্ষণ, নির্যাতন, চরিত্রহনন, গণহত্যা, নৃশংসতা, ক্ষমতার দম্ভ, প্রভৃতি অনাচার দানবীয় রূপ গ্রহণ করেছে। করোনা
আসার পরও অধিকাংশ দেশে পর্ণোগ্রাফি দেখার হার বেড়েছে, সেক্স টয় বিক্রির হার বেড়েছে, স্বাস্থ্য সরঞ্জাম লুট হচ্ছে, দেশে চাল চুরি বেড়েছে। নৈতিক দেউলিয়াত্ব সর্বগ্রাসী হয়েছে।

রমযানের রোযা রেখেও মুসলিমরা দিনভর সিনেমা দেখছে, গান-বাজনায় মত্ত থাকছে। মহান আল্লাহর বাণীটি পড়ার মানসিকতা বা তার বক্তব্য অনুধাবনের চেষ্টা করা আজ সময়ের অনিবার্য দাবী হয়ে উঠেছে। এই জন্য কেউ কেউ কুরআনের মর্মবাণী অনুধাবনের জন্য অর্থসহ কুরআন পড়ার চেষ্টা করছে। এ বিপদ- মুসিবতে তাদের ঈমান দৃঢ় হচ্ছে, আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুমিনদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তারা শক্তিশালী হচ্ছে।

করোনার আঘাতে বড় দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঝড়ে বড় গাছের ডালপালা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত দুই শতাব্দী ধরে পশ্চিমারা মুসলিম দেশগুলোর ওপর একতরফা নির্যাতন চালিয়ে আসছে। প্রথম মহাযুদ্ধে তুর্কী সালতানাতের পতনের পর মুসলিম দেশগুলো ইউরোপের উপনিবেশে পরিণত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপ দুর্বল হলে অধিকাংশ মুসলিম দেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে শুরু করে। অবশ্য স্বাধীনতা লাভ করলেও পরোক্ষভাবে মুসলিম বিশ্ব এখনো তাদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। তবে আশা করা যায়, করোনার পর বিশ্বে নতুন করে পরিবর্তনের সূচনা হবে।

আমেরিকার একাধিপত্যের দিন শেষ হবে। মুসলিম দেশসমূহে ইউরোপ-আমেরিকার হস্তক্ষেপের সামর্থ্য ক্রমেই হ্রাস পাবে। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বে সেক্যুলারদের অবস্থান দুর্বল হবে।পাশ্চাত্যের ব্যাপারে মুসলিমদের মোহভঙ্গ হবে। শেষ পর্যন্ত করোনা মুসলিম বিশ্বের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ। সেটা হবে আল্লাহর অনুগ্রহে, তবে আল্লাহর বাণি বাহকদের বুদ্ধি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা দায়িত্বপালন করতে হবে।

করোনা অবশ্য মুসলিম উম্মাহর দুর্বলতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। রাসূল (সাঃ) ১৪০০ বছর পূর্বে এ ধরণের পরিস্থিতিতে করণীয় কি তা বলে গেছেন। কিন্তু ডবিউএইচও বলার পূর্বে আলেম সমাজ আমাদেরকে তা বলতে পারেননি। উল্টা বিভিন্ন বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য রেখে পরবেশ ঘোলা করেছে। সামাজিক মাধ্যমে হাস্যকর এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

মক্কায় দুর্ভিক্ষে রাসূল (সাঃ) কুরাইশদের খাদ্য ও স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। অথচ আমাদের অনেক লাখ টাকার ওয়াজিনদের এখন এ দুর্যোগে দেখা যায় না। খেলাফত ধ্বংস হওয়ার পর থেকে ধর্মীয় ব্যাপারে মানুষ শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তে আলেমদের নির্দেশনাই মেনে চলেছে। কিন্তু বর্তমানে ধর্মীয় ব্যাপারেও আলেম সমাজ সম্মিলিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না।

আগামী দিনের অর্থনৈতিক মন্দায় করণীয় কি সে ব্যাপারেও তাদের কাছ থেকে কোনো দিক নির্দেশনা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ব্যস্ত বিভিন্ন ধর্মীয় ফিকহী ছোট খাটো মাসলা-মাসায়েলের বিবাধে। তাও নিজের পছন্দের মাসলকের বিরুদ্ধে ফাতওয়া গেলেই তা শুরু হয়। বিপরীত দিকে আরো শক্তিশালী যুক্তি থাকলেও তা যদি দেওবন্দি সালাফদের মতের বাহিরে হয়; তাহলে কোনভাবেই তা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আজব! কেতনাহি জাহিলিয়্যাত! আমাদেরকে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, ফেরাউনের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য মূসা (আঃ)-এঁর ছিল আল্লাহর নিদর্শন লাঠি আর আমাদের কাছে আছে আল্লাহর নিদর্শন আল কুরআন। সেই কুরআনকে আঁকড়ে ধরতে হবে। এর মর্মবাণি অনুধাবন করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সামর্থ্য দিন। আমীন!

লেখকঃ

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সময়নিউজ২৪.কম/ বি এম এম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *