করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

লাবু হক
ঘরের দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদ-উল আযহা। স্টেশনে স্টেশনে টিকিট সংগ্রহের জন্য নেই কোনো শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভীড়। টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে না ট্রেনের ছাদে কিংবা লঞ্চে করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরা শিক্ষার্থীদের ছবি! মহামারী করোনাভাইরাস তাদের ঘরবন্দী করে রেখেছে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে। ঘাতক এ ভাইরাস গত রমজানের ঈদ আনন্দে হানা দিয়ে এবার হানা দিলো কুরবানি ঈদে।
প্রতিবছর ঈদকে ঘিরে কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম প্রস্তুতি চলে থাকে। তবে এবারে কুরবানি পশু পর্যন্ত কিনতে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ যেন এক অন্য রকম ঈদ! তারপরও ঈদের আনন্দ কিছুটা উপভোগ করতে যে যার মতো করে নিচ্ছে প্রস্তুতি। করোনাকালীন এই সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কেমন চলছে ঈদের প্রস্তুতি? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে তাঁদের ঈদ ভাবনা তুলে ধরা হলো।
আরিফুল ইসলাম রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ মানেই খুশি, এই একটি শব্দের মধ্যেই যেন নিহিত আছে এক পৃথিবী আনন্দ! বছরের দুটি দিনের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের হলো দুই ঈদের দিন। নতুন পাঞ্জাবি পরে আতর লাগিয়ে ঈদগাহে নামাজ পরা, কোলাকুলি করা, সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করা সবমিলিয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করে ঈদের দিনে। বিশেষত আমরা যারা শিক্ষার্থী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে অনেক জ্যাম কাটিয়ে মায়ের কোলে ফিরে আসতাম, তার মধ্যেই অনেক ভালোলাগা কাজ করতো। তবে এবারে ঈদ-আনন্দের মধ্যে হানা দিয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস। যার ফলে আমরা আজ প্রায় ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ঘরবন্দি। প্রতিবছর দিনটি ঘিরে বিভিন্ন পরিকল্পনা, বাড়তি আনন্দ থাকলেও এবারে তা নেই। ভাবছি যেসব বন্ধুদের সাথে এই দীর্ঘ ৪ মাস অবধি কথা হয়নি, তাদের সাথে কথা বলবো। পরিবারকে সময় দেবো। আসুন সংকটকালীন সময়ে সবাই সবার পাশে দাঁড়াই।
আছিয়া খাতুন চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে ঈদের সেই চিরচেনা আমেজ। প্রতি মুহূর্তে নতুন সংক্রমণ, নতুন মৃত্যুর খবরে সবাই আতঙ্কিত! এরই মধ্যেই গত হলো পহেলা বৈশাখ ও ঈদ-উল ফিতর। এবার আসছে ঈদ-উল আযহা। সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পন করেছি। ঈদকে উপলক্ষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার আনন্দটা যে কেমন তা বাস্তবে উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়নি ঘাতক এ ভাইরাসের জন্য। এবারের ঈদগুলো যেন অন্যরকম। ঈদে ঘোরাফেরার চেয়ে উল্টো বাড়িতে থেকেই তা পালন করতে হচ্ছে। ভাবছি করোনাকালীন এবারের ঈদের পুরো সময়টা পরিবারের সঙ্গে কাটাব। আম্মুকে রান্নার কাজে সহযোগিতা ছাড়াও অনলাইনে বন্ধুদের সাথে ঈদের সৌহার্দ্য বিনিময় করবো।
আবু তালহা সিহাব আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ মানে বছরের সেরা আনন্দটুকু ভাগাভাগি, ঈদ মানে এক অন্যরকম অনুভূতি! আমার কাছে ঈদ মানে ঘরে ফেরার গল্প, চিরচেনা মুখগুলোর সাথে আনন্দ ভাগাভাগির উদ্যম। কিন্তু এবারের ঈদের গল্পটা সবার কাছে ভিন্ন। ঈদে টিকিট কেটে বাড়ি ফেরার সেই আনন্দের শুরুটা কয়েক মাস আগেই ঘরবন্দি হয়ে কাটছে। গত বছরে যেখানে সম্পূর্ণ আনন্দে কাটিয়েছিলাম সেখানে ভাবতেই পারিনি এবারের ঈদটা ঈদগাহে না গিয়ে অতি সাধারণভাবে কাটাতে হবে। বিগত বছরগুলোতে ঈদের আমেজ দু-চারদিন স্থায়ী থাকলেও এবারের করোনাকালীন পরিবার ও প্রিয়জনদের সুরক্ষার কথা ভেবেই ঈদের অনুভূতিগুলো বাড়িতে থেকেই ভাগ করে নেব। সেই সঙ্গে এই সংকটকালীন সময় একে অন্যর সাহায্য থেকে ঈদের আনন্দের স্রোত সবার মাঝে প্রবাহিত হোক এই কামনা করি।
ফাহমিদা ফুজি রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ শব্দটা শুনলেই মনের ভিতরে অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করে। বিশেষত বাংলা একাডেমি প্রণীত নতুন বানান “ইদ” এর চেয়ে ছোট্টবেলা থেকে ব্যবহার করে আসা “ঈদ” শব্দটার মাঝে। সময়ের স্রোতে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে, কমে গেছে ঈদের আনন্দও। চারদিকে মহামারী, বন্যা, মানুষের হাহাকার আর আতঙ্কের মধ্যে দীর্ঘ ৪ মাস ধরে গৃহবন্দি থাকা একঘেয়ে জীবনে আসা এই ঈদটাও বাসার মধ্যেই কাটাতে হবে। কেনাকাটা, নতুন পোশাক আর ঘোরাঘুরির পরিবর্তে হয়তো কুরবানির পশুর সাথে সেলফি, হাতে মেহেদি আর মাংসের নতুন নতুন রেসিপি নিয়ে ঈদ কাটাতে হবে। সামাজিক দূরত্বের কারণে এবার আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে যাওয়া হবে না। পরিবার আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করব ভাবছি। কয়েকজন বন্ধু মিলে ঈদে সংকটাপন্নদের যতটা সম্ভব সহায়তা করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এটাই হয়তো এবারের ঈদে আনন্দ কিছুটা বাড়িয়ে দেবে। আশাকরি একদিন চারপাশ ভাইরাস মুক্ত হবে, মানুষের মধ্যে দূরত্ব আর বৈষম্য দূর হবে। সেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি পর্যন্ত সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন, অসহায়দের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিন আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুন্দর দিন কাটান।
সময় নিউজ২৪.কম/বি এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *