করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে ইসলামের দৃস্টিতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় মিলবে মুক্তি

বিল্লাল বিন কাশেম ও তাহমিনা শারমিন: 
প্রাণঘাতী মহামারী ভাইরাস কভিট-১৯। আজ সারা বিশ্ব এখন এটি আতঙ্ক। যা কেড়ে নিচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষের প্রাণ। প্রত্যেজটি মহাদেশে এটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে। ধনী-গরীব, সাদা কালো, ধর্ম-বর্ণ, গোত্র কোন বাছবিচার করছে না সক্রামক এ ভাইরাসটি। সারা বিশ্বের মানুষের জীবন করে তুলেছে দুর্বিসহ। আর এই ভাইরাসটি ছড়ায় মূলত অপরিস্কার- অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বা শিষ্টাচার বহির্ভুত জীবনযাপনে। জানা যায়, এই করোনা ভাইরাসটি ছড়ায় জনসমাবেশ, বাজার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও রোগাক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে।
আর এসব জটিল পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় ইসলামের বিধানে আছে সুস্পষ্ট কিছু রীতিনীতি ও ইসলামী বিধান। প্রতিটি ব্যক্তির সুস্বাস্থ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছে। যেখানে কিছু কিছু জাতি আধ্যাত্মিকতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচ্ছন্নতা ও নিজের যত্ন নেওয়া পরিত্যাগ করেছে সেখানে ইসলাম এটাকে প্রতিদিন নামাজের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে।
প্রত্যেকের স্বাস্থ্যবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখাকে ইসলাম শুধু উত্তম অভ্যাস হিসেবেই বিবেচনা করে না বরং একে ইমানদারদের জন্য অনুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত করেছে। একজন মুসলিমের জন্য তার প্রতিদিনকার ইবাদাতের পূর্বে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন, যা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের পর ভালোভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা এবং ওজু করাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বিশ্বব্যাপী মহামারী রুপ নেয়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসটি অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্নতা থেকে সৃষ্ট বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এই মহামারী থেকে বাচঁতে যে সকল নিয়মাবলী অনুসরণ করার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা তাদেরও মূল বানী হচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। মূলত অপরিচ্ছন্ন বাজার, পরিবেশ, অস্বাস্থ্যকর খাবার আর জীবন যাপন ব্যবস্থার নোংড়ামো থেকেই এই ভাইরাসটি শক্তিশালী প্রাণঘাতী রুপে মানব সভ্যতাতে ধ্বংস করে যাচ্ছে ক্রমাগত।
অসুস্থ মানুষ আজ সবার কাছে নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হতে চলেছে। না আছে এই কভিট ১৯ এর কোনোও চিকিৎসা ব্যবস্থা। না আছে কোনো টিকা বা প্রতিশেধক। এখনো পর্যন্ত কোনও এন্টিবায়োটিকও এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পারছে না। আর এ থেকে বাচঁতে হলে সবাইকে সুস্থ থাকার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ধর্মীয় রীতি নীতি অনুসরণ করে জীবন যাপন করাই একমাত্র সতর্কতা কিংবা বাঁচার প্রক্রিয়া। শুধু জীবন যাপনে সুস্থ্যভাবে বাচঁতে নয়, ইবাদতেও একজন সুস্থ্য মানুষের মূল্যায়ন অধিক।
দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় দিকেই মানুষের কল্যাণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া ইসলামের জন্য অবাক করা কিছু না। একজন দুর্বল ইমানদার ব্যক্তির তুলনায় একজন সুস্বাস্থের অধিকারী ইমানদার ব্যক্তিই মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহর নিকট বেশি পছন্দনীয়। কেননা সে মহান আল্লাহর দেওয়া হুকুম পালনে এবং মানুষের কল্যাণ সাধনে বেশি উপযোগী।
এই হাদিস সমূহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সুস্বাস্থ্য রক্ষার প্রতি ইসলাম যে গুরুত্বারোপ করেছে তার অল্প কিছু উদাহরণ মাত্র: পবিত্রতা ঈমানের একটি অংশ- আবু মালিক আল-আশা’আরি (র.) হতে বর্ণিত, যে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধাংশ।’ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা মানুষের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য- আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শুক্রবার গোসল করে এবং তা ভালোভাবে করে, নিজেকে পবিত্র করে এবং তা ভালো ভাবে করে, এবং তার সবচেয়ে উত্তম পোশাক পরিধান করে, এবং আল্লাহ তার জন্যে যা রেখেছেন তার পরিবারের সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর মসজিদে আগমন করে এবং নিজেকে অযথা কথায় জড়ায় না এবং দুই ব্যক্তিকে আলাদা করে তাদের মাঝে প্রবেশ করে না; আল্লাহ পাক ঐ ব্যক্তির সেই জুমা হতে তার আগের জুমা (শুক্রবারের) পর্যন্ত সকল গুনাহ মাফ করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ -আলবানি দ্বারা প্রমাণিত)।
পরিবেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা- মুয়ায (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তিনটি কাজ হতে সতর্ক হও যা তোমাদের অভিশপ্ত করে; এমন ছায়া বিছানো জায়গায় বিশ্রাম নেওয়া যা মানুষ ব্যবহার করে, হাটার পথে বা কোনো জলসেচন জায়গায়।’ (আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন)। ওষুধ বা চিকিৎসা নেওয়াকে উৎসাহিত করেছেন, উসামা ইবনে শারিক (রা.) বর্ণনা করেছেন,
একদা আমি রাসূল (সা.) এর নিকট আসলাম, তাঁর সাথীগণ তখন এমন শান্তভাবে বসে ছিল যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে। আমি সালাম দিয়ে বসে পড়লাম।
মরুভূমির কিছু আরব লোক আসলো আশপাশ থেকে। অতঃপর তারা রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলো, আমরা কি কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবো? তিনি উত্তর দিলেন, চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা আল্লাহ প্রতিকার ছাড়া কোনো অসুখ তৈরি করেন নি, শুধু একটি রোগ ব্যতীত, আর তা হলো বার্ধক্য।’ (আবু দাউদ)
শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান হওয়া- হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘একজন বলশালী ইমানদার আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয় একজন দুর্বল ইমানদার ব্যক্তির চেয়ে, এবং তারা দুজনই উত্তম। গভীরভাবে তাই অন্বেষণ করো যা তোমার উপকার করে, একমাত্র আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করো এবং হাল ছেড়ো না। যদি কোনো কিছুতে অকৃতকার্য হও, তবে একথা বলো না যে, যদি এটা না করে অন্য কিছু করতাম! বরং বল যে ‘আল্লাহ যা করেছেন ঠিক করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।’ (সহিহ বুখারি)।
অতিরিক্ত খাওয়া অস্বাস্থ্যকর- আল- মিকদাম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মানুষ তার পেটের চেয়ে অধিক খারাপভাবে কোনো পাত্র ভর্তি করতে পারে না।
কয়েক টুকরা যা তার পিঠ সোজা রাখার জন্য যথেষ্ট। যদি তার প্রয়োজন হয় তবে তার উচিত তার পাকস্থলির তিন ভাগের এক ভাগ খাবারের জন্য রাখা, এক ভাগ পানির জন্য রাখা এবং এক ভাগ শ্বাস নেয়ার জন্য রাখা।’ (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি)
সুস্বাস্থ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যপারে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করে। যেখানে কিছু কিছু জাতি আধ্যাত্মিকতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচ্ছন্নতা ও নিজের যত্ন নেওয়া পরিত্যাগ করেছে সেখানে ইসলাম এটাকে প্রতিদিন নামাযের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে। প্রত্যেকের স্বাস্থ্যবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখাকে ইসলাম শুধু উত্তম অভ্যাস হিসেবেই বিবেচনা করে না বরং একে ইমানদারদের জন্য অনুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত করেছে। যেমনটা উপরে বলা হয়েছে যে, একজন মুসলিমের জন্য তার প্রতিদিনকার ইবাদাতের পূর্বে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন, যা টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা এবং ওযু করাকে অন্তর্ভুক্ত করে। ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা মানুষের জন্মগত স্বভাব। নিজেকে সুন্দর রাখার প্রথম এবং প্রধান উপায় হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না রাখলে অনেক মূল্যবান জিনিসই মূল্যহীন হয়ে যায়। জীব-জানোয়ার ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এটাই যে, পশুরা যেমন খুশি তেমন চলে, তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ধার ধারে না; আর মানুষ পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল জীবন-যাপন করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষার বিষয়টিকে সাধারণত মানুষ স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করলেও ঈমানদার মুসলমানেরা এটিকে ইবাদতরূপে গণ্য করে থাকেন। কেননা নবী করিম (স) বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।’ (মুসলিম)
উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বিশেষজ্ঞরা বারবার হাত ধুতে পরামর্শ দিয়েছেন। ইসলামের বিধান কিন্তু সব সময় এ নির্দেশ দিয়ে এসেছে। কেনান, ধর্মপ্রাণ মুসলমান কম করে হলেও প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পূর্বে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ওজু করেন। তিনি দৈনিক ৫ বার ওজু করার জন্য ১৫ বার হাত, পা, নাক, মুখ ও চোখ পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করেন। সময়মতো দিনে একবার গোসল করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ সবসময় ধুয়ে মুছে পরিষ্কার রাখেন। ঈমানদার লোকের বসত-বাড়ি ও ঘরের আঙিনা পরিচ্ছন্ন থাকে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্রতাকে পছন্দ করেন, তিনি পরিচ্ছন্ন এবং তিনি পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করেন।’ (তিরমিজি)দৈহিক রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে হলে দেহকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানব দেহের প্রধান শত্রু।
এজন্য ইসলাম সুন্দর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার বিধান দিয়েছে। পরিষ্কার কাপড়-চোপড় ও পবিত্র দেহ ছাড়া নামাজ হয় না। রাসূলুল্লাহ (স) পবিত্রতাকে নামাজের চাবি বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলাম ধর্মে পবিত্রতার প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘(হে নবী!) তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ!’ (সূরা আল-মুদ্দাছিছর, আয়াত: ৪)। মহানবী (স) ছিলেন পরিচ্ছন্নতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর সব কাজকর্ম ছিল গোছানো। তিনি ঘরের সবকিছু পরিপাটি করে রাখতেন।
শয়নের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বিছানা ঝাড় দিতেন। জুতা, কাপড় ইত্যাদি পরিধানের পূর্বে তিনি ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করে নিতেন। তিনি সুগন্ধি পছন্দ করতেন। সৌন্দর্যের প্রতীক ফুলও তাঁর খুব প্রিয় ছিল। তিনি রাতে ঘুম যাওয়ার পূর্বে এবং ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াক করতেন। (যাদুল মায়াদ) নামাজী ব্যক্তি নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহারের কারণে অসংখ্য রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি পায়। জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও তিনি মিসওয়াক করার জন্য বারবার ইশারা করছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টদায়ক না মনে করতাম, তাহলে প্রত্যেক নামাজের ওজুর সাথে তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (বুখারী)। তিনি আরো বলেছেন, ‘মিসওয়াক মুখকে পরিষ্কার করে, আর আল্লাহর কাছে এ আমল বেশি পছন্দনীয়।’ (নাসাঈ)।
সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *