কিশোরগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতায় পাঁচটি উপজেলায় প্রসূতি সেবা এক যুগেরও বেশী সময় ধরে বন্ধ রয়েছে

রাজিবুল হক সিদ্দিকী, কিশোরগঞ্জ:

কিশোরগঞ্জের পাঁচটি উপজেলা হাসপাতালে প্রসূতি অস্ত্রোপাচার (সিজার অপারেশন) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।অবকাঠামো, অপারেশন থিয়েটার, যন্ত্রপাতিসহ ২৫ কোটি টাকার সম্পদ এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে।

সার্জন ও এনেসথেসিয়া না থাকায় প্রসূতি সেবা কার্যক্রম মুখথুবড়ে পড়ে আছে। অপারেশন কার্যক্রম বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য প্রসূতিকে শহরের প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করাতে হচ্ছে।বেসরকারি এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে,২০০২ সালে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকার প্রসূতি মা ও শিশুদের সঠিক, আধুনিক ও উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য কিশোরগঞ্জের পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জেলার করিমগঞ্জ, নিকলী, ভৈরব, মিঠামইন ও কটিয়াদীকে ওই কর্মসূচির আওতায় এনে প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্ণাঙ্গ নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়।

ভবনগুলোতে রোগী থাকা, দর্শনার্থীদের বসার কক্ষ, নবজাতক কক্ষ, লেবার রুমসহ যন্ত্রপাতি দিয়ে আধুনিক অস্ত্রোপচার কক্ষ নির্মাণ করা হয়। এ কাজে পাঁচটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫ কোটি টাকারও বেশি
ব্যয় হয়। পরে ওইসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবেদনবিদ ও প্রসূতি সার্জনের নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি অস্ত্রোপচার শুরু হয়। ১২৫টি অস্ত্রোপচারের পর ডিসেম্বর মাসে হাসপাতালের প্রসূতি সার্জন আমিনুর রহমান বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। পরে হাসপাতালে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাই ১৩ বছর ধরে অপারেশন বন্ধ রয়েছে।

বর্তমানে গাইনি সার্জন আছেন; কিন্তু এনেসথেসিয়া প্রেষণে জেলা সদরে অবস্থান করায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। তাই এখন প্রসূতিদের যেতে হচ্ছে জেলা সদরে। আর অপারেশন থিয়েটারসহ যন্ত্রপাতি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

২০০৩ সালে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি অস্ত্রোপাচার শুরু হয়।ওই বছরের ডিসেম্বরে এনেসথেসিয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেষণে চলে যান। এর পর ১৬ বছর ধরে হাসপাতালে প্রসূতি অস্ত্রোপাচার সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

হাওরের উপজেলা মিঠামইনে কোটি টাকা ব্যয় করে অস্ত্রোপাচার কক্ষ ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করে প্রসূতি সেবার বিশাল আয়োজন করা হয়। অথচ গাইনি সার্জন ও এনেসথেসিয়া পদে কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে এ উপজেলায় প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম গত ১৬ বছরেও শুরু করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ।

নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি সার্জন নিয়োগ হলেও এনেসথেসিয়া ও সেবিকা না থাকায় গত ১৪ বছরে প্রসূতি অস্ত্রোপচার হয়নি একটিও।

করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা গ্রামের রোকেয়া বেগমসহ (২৮) অসংখ্য প্রসূতি জানান, বাধ্য হয়ে তারা কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মা হয়েছেন। মা হতে গিয়ে তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে।

ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি গ্রামের রুহুল মিয়া জানান, করিমগঞ্জ হাসপাতালে সিজার করার ব্যবস্থা না থাকায় ১৬ হাজার টাকা খরচ করে জেলা শহরের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে তার স্ত্রীকে অপারেশনের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম দিতে হয়েছে। একজন বর্গাচাষি হিসেবে এ টাকা খরচ করতে তার খুব কষ্ট হয়েছে।

মিঠামইন উপজেলার গোপদীঘি গ্রামের আনার মিয়া জানান, মিঠামইন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি সেবার সব ধরণের ব্যবস্থা থাকার পরও শুধু চিকিৎসক, সার্জনের ও এনেসথেসিয়া না থাকায় স্ত্রীকে জেলা শহরের একটি ক্লিনিকে ১৮ হাজার টাকায় অপারেশন করাতে হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জানান, গ্রামীণ পর্যায়ে প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। তাই বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে সিজারসহ অন্যান্য অপারেশনের জন্য অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে।

জনবল সংকটের কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পারেনি।যার ফলে শহরের বেসরকারী ক্লিনিকে রমরমা ব্যবসা। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ক্লিনিক গুলো গলাকাটা ব্যবসা করছে। ফলে দেখার কেউ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ এর দেখভাল করলেও স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন বেসরকারী ক্লিনিকের সাথে জড়িত থাকায় এবং তাদের স্বার্থেই সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।

সময়নিউজ২৪.কম / বি এম এম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *