কিশোরগঞ্জে নরসুন্দা লেক প্রকল্প অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের পর ফের দখলদারদের অবৈধ মার্কেট নির্মাণ

রাজিবুর হক সিদ্দিকী, কিশোরগঞ্জ:

কিশোরগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদী উদ্ধারের নামে ২০১৪ সালে নদীর দু’পার থেকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সুরম্য অট্টালিকা, মার্কেট আর অবৈধ সব স্থাপনা। প্রশাসনের এই নজিরবিহীন উদ্যোগে নরসুন্দা নদী নিয়ে শহরবাসীর মনে নতুন আশাবাদ সঞ্চারিত হলেও মাত্র তিন
বছরের ব্যবধানে সেই আশা এখন দু’স্বপ্ন। দখলমুক্ত করা নদীপারের অধিকাংশ স্থান আবারও এক শ্রেণির অসাধুচক্রের হাতে বেহাত হতে চলেছে। বিশেষ করে শহরের গৌরাঙ্গ বাজার ব্রিজ সংলগ্ন নিউ মার্কেট এলাকার মূল রাস্তার দু’পাশের বিশাল চত্বরটি তথাকথিত ‘নদী বাংলা’ হকার্স মার্কেটের নামে অবৈধ দখলে চলে গেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে ওই হকার্স সমিতির মার্কেট। অথচ কিছুদিন আগেও এখানে ছিল চারতলা সুরম্য অট্টালিকার দৃষ্টিনন্দন ভবন। যে ভবনের দ্বিতলে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, কিশোরগঞ্জ শাখার অফিসসহ অজ¯্র দোকানপাট। সেই দৃষ্টিনন্দন ভবনটি গুঁড়িয়ে দিয়ে নদীপারের বিশাল চত্বরে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে একটি শিশুপার্ক গড়ে উঠেছে।

পার্কটি উদ্বোধন হবার আগেই পার্কের মূল ফটকের সম্মুখভাগ থেকে মূল সড়কের পাশ পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে হকার্স মার্কেটের নামে শতাধিক স্থাপনা। মহামান্য হাইকোর্টের দোহাই দিয়ে দখলবাজরা একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে। এতে লেখা রয়েছে “এই সম্পত্তির মালিক সাইফুল হক গং যাহা মহামান্য হাইকোর্টের রীট পিটিশন নং- ৭৫২৪/২০১৫ মূলে মালিক”।

ফলে সুদৃশ্য শিশুপার্কটি যেমন দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেছে, তেমনি দখলমুক্ত হওয়া নদীপারের সৌন্দর্যও বিনষ্ট হয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের নাকের ডগায় এই দখল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এ সকল অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করা গেলে ভবিষ্যতে এই অবৈধ মার্কেট উচ্ছেদে নানাবিধ আইনী জটিলতা ও মানবিকতার প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করেন শহরের সচেতন মহল।

এছাড়াও একরামপুর এলাকায় ব্রীজের দুপাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জায়গা খালি করলেও বর্তমানে দখলবাজরা দোকানপাট নির্মাণ করে ফের দখল করে নিয়েছে। যা দেখার কেউ নেই।

এলাকাবাসী জানায়, নরসুন্দা নদী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১৪ সালের শেষ দিকে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষ সততা ও দৃঢ়তার প্রতীক তৎকালীন সিনিয়র নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আবু তাহের মো. সাঈদের নেতৃত্বে প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নরসুন্দা পাড়ের এই ভূমিতে নির্মিত বহুতল ভবন বুলডোজার দিয়ে ভেঙে প্রায় দুই মাস কাজ করে নদীর ওই ভূমিটি উদ্ধার করা হয়। পরে নরসুন্দা নদীর শোভাবর্ধনের কাজ ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার পর পরই প্রভাবশালীরা উচ্ছেদকৃত ওই ভূমিটি দখল করে মার্কেট
প্রতিষ্ঠা করে ফেলে।

মার্কেটের দোকানি আলিম মিয়া, আবদুল কাদেরসহ একাধিক দোকানি জানান, তারা নাকি অনেক বড় মানুষের সাথে আলাপ করে এখানে দোকান ও মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসা করছেন। তাছাড়া নদী বাংলা মার্কেটের কমিটির রয়েছে।

কমিটির সাথে সাথে আলাপ করে বিস্তারিত জানতে প্রতিবেদককে উপদেশ দেন।কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, নরসুন্দার উচ্ছেদকৃত প্রায় শত কোটি টাকার ভূমি দখল করে মার্কেট নির্মাণ সবার নজর কেড়েছে। কিন্তু কেউ কথা বলছে না। প্রশাসন থেকে কোন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে না।

এসব বিষয় দেখে আমি বিষয়টি জেলা আইন-শৃংখলা কমিটির সভায় উত্থাপন করে প্রশাসনের সবার নজরে এনেছি। সভার সদস্যরা মার্কেট উচ্ছেদের ব্যাপারে আমার বক্তব্য সমর্থন করেছে।

কিশোরগঞ্জ পৌর মেয়র মোঃ পারভেজ মিয়ার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে মার্কেট করার অনুমতি পৌর কর্তৃপক্ষ দেয়নি। উচ্ছেদকৃত ভূমি দখল করে মার্কেট নির্মাণ করায় পৌর শিশু পার্কটির চালু করা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক মোঃ সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। উচ্ছেদকৃত ভূমিতে পুণরায় অবৈধ মার্কেট নিমার্ণে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাদের সাহস দেখে হতবাক হতে হয়। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিশোরগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা মঞ্চের সভাপতি অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ সাদী বলেন, নদীর অবৈধ
দখলদারদের উচ্ছেদ করতে গত ২০ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে এসেছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের একান্ত ইচ্ছা ও আগ্রহে নরসুন্দা শোভাবর্ধন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

অভিযুক্ত ‘নদী বাংলা হকার্স মার্কেট কমিটির সভাপতি তৌফিক মিয়াকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রশাসন বা পৌরসভার কোন অনুমতি নিয়ে তারা এই মার্কেট করেননি। তাদের প্রয়োজনে তারা মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসাইয় করছেন। এ পর্যন্ত প্রশাসন থেকে বা পৌরসভার কাছে থেকে তারা কোন বাধা বা নিষেধের নোটিশ পাননি।

সময়নিউজ২৪.কম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *