গগন ডাকাত পূজো করত শক্তির দেবী কালীর

 managed wordpress hosting

উজ্জ্বল রায় ………

তখন এখানে চারপাশে ঘন জঙ্গল। কথিত আছে, রঘু ও গগন ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ঘটে ফুল চড়িয়ে পুজো করতেন। যদি ঘট থেকে ফুল পড়ত, তাহলে তাঁরা ডাকাতি করতে যেতেন। ফুল না পড়লে যেতেন না। তাঁরা মনে করতেন, ফুল পড়া মানে মায়ের আশীর্বাদ রয়েছে। একদিন তাঁরা ডাকাতি করতে বেরিয়েছিলেন। যেতে যেতে হাজির হয়েছিলেন সিঙ্ধসঢ়;গুরের এই পুরুষোত্তমপুর গ্রামে। সেখানে রঘু ও গগন ডাকাতই ঘট স্থাপন করে মা কালীর পুজো শুরু করেছিলেন। ডাকাতদের প্রতিষ্ঠিত পুজো বলেই আমাদের মায়ের নাম ডাকাত কালী।

রঘু ও গগন ডাকাত ঘটে পুজো শুরু করার পর পুরুষোত্তমপুরের পাশের চালকেবাটি গ্রামের এক মোড়লকে মা কালী স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন। তিনি গোরুর পিঠে ধানের বস্তা নিয়ে শেওড়াফুলি যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী। একটি গাছের তলায় বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তখনই মা কালী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন, ঘটে পুজোর বদলে যেন প্রতিমায় পুজো হয়।

আর প্রতিমা যেন তিনিই তৈরি করেন। স্বপ্নাদেশে মা তাঁকে জানান, বাজারে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়ি ফিরে যেতে। মায়ের স্বপ্ন পেয়ে ওই মোড়ল বাড়ি ফিরে যান। বাড়িতে গিয়ে দেখেন, তাঁর ধানের বস্তার ওজন কয়েকশোগুণ ভারী হয়ে গিয়েছে। তিনি অবাক হয়ে যান। তারপর বস্তার মুখ খুলতেই তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। কারণ, ধানের বস্তা তখন মোহরের বস্তায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু, প্রতিমা তৈরির পর মা থাকবেন কোথায়? বাইরে তো রাখা যাবে না। কারণ, ঝড়-বৃষ্টিতে তো মাটির প্রতিমা নষ্ট হয়ে যাবে।

সে কথা প্রার্থনা করে ওই মোড়ল মাকে জানালেন। তারপর মা কালী বর্ধমানের মহারাজাকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন, তাঁর মন্দির তৈরি করে দেওয়ার জন্য। মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়েই মহারাজা তাঁর জন্য মন্দির স্থাপন করেন। মন্দির তৈরির হওয়ার পর মন্দিরের ভিতরে ওই মোড়ল মায়ের প্রতিমা তৈরি করেন। সেই থেকে এখানে প্রতিমায় পুজো শুরু হয়। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মায়ের প্রতিমা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে এখানে নবকলেবর হয়। মায়ের পুজো করার জন্য বর্ধমানের মহারাজাই আমাদের পূর্বপুরুষদের সেবাইত হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন। তারপর থেকে আমরাই মায়ের পুজো করে আসছি। এখানে ছ’জন সেবায়েত রয়েছেন। প্রতি ছ’বছর অন্তর আমাদের পুজোর দায়িত্ব পড়ে।

যে সময় এই পুজো শুরু হয়, সেই সময়ের ডাকাতরা সবাই শুদ্র সম্প্রদায়ের ছিলেন। যেহেতু, রঘু ও গগন ডাকাত ঘটে পুজো শুরু করেছিলেন, তাই শূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষেরাই গঙ্গা থেকে ঘটের জন্য জল নিয়ে আসেন। সেই প্রথার অন্যথা হয়নি এখনও। কালীপুজোর সময় বছরে একবারই ঘটের জল বদল করা হয়। কারও দেখা চলে না। তাই জল বদলের সময় মন্দিরের দরজাও বন্ধ থাকে।

এই ডাকাত কালী পুজোয় আগে নরবলি দেওয়া হতো বলে শোনা যায়। এখন ছাগ বলি দেওয়া হয়। তবে, এই ছাগ বলিরও নির্দিষ্ট একটি নিয়ম রয়েছে। কালীপুজোর রাতে চার প্রহরে চারবার বলি দেওয়া হয়। কালীপুজোর পরদিন গোধূলিলগ্নে আরও একবার ছাগ বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। সেই সন্ধিক্ষণের বলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় মিশকালো ছাগ বলি দেওয়া হয়। সেই ছাগের গায়ে কোনও সাদা অথবা খয়েরি ছাপ থাকা চলে না।

কালীপুজোর আগে টানা ন’দিন এখানে চ-ীপাঠ হয়। আটদিন ধরে হয় মায়ের অষ্টমঙ্গলা। এখানে সারাবছরই মায়ের নিত্যপুজো হয়। ভোর প্রহরে ও সন্ধ্যায় আরতিও করা হয়। তবে, কালীপুজোর সময় এই ডাকাত কালী মন্দিরে হাজার হাজার ভক্তের সমাগমে তিল ধারণের জায়গা থাকে না।

এই ডাকাত কালী মন্দিরে মা সারদাদেবীকে নিয়েও একটি কাহিনী রয়েছে। তিনি একবার জয়রামবাটি-কামারপুর থেকে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই এই চত্বরে একটি গাছের তলায় তিনি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসেছিলেন। তখন একদল ডাকাতের খপ্পরে পড়েন তিনি। কিন্তু সারদাদেবীকে আটকাতে গিয়ে স্বয়ং মা কালীর দর্শন পান ডাকাতরা। তারপর ডাকাতরা মা সারদাকে ছেড়ে দেন। গাছতলায় বসিয়ে মাকে তাঁরা চাল-কড়াই ভাজাও খেতে দিয়েছিলেন। তাই কালীপুজোর সময় এখনও প্রতিবছর আমাদের এখানে মাকে চাল-কড়াই ভাজা উৎসর্গ করা হয়। সিঙ্ধসঢ়;গুরের পুরুষোত্তমপুরে এই ডাকাত কালী মন্দিরের মা খুবই জাগ্রত। কালীপুজোর দিন এই মন্দির হয়ে ওঠে মিলনক্ষেত্র। ডাকাত কালী মন্দিরের অন্যতম সেবায়েত কল্লোল ভট্টাচার্য (মনোহর ডাকাতের কালী পুজোর বর্তমান প্রধান সেবায়েত)

যখন ছোট ছিলাম, তখন বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে ডাকাতদের সম্পর্কে পড়েছি। সেখান থেকেই জেনেছি, ডাকাতদের উপাসনা করত শক্তির দেবী মা কালীর। ছোটবেলায় সিনেমাতেও দেখতাম, ডাকাতরা কীভাবে লুটের পর মা কালীর কাছে এসে সেগুলি সঁপে দিত। বুঝতে শেখার পর জানতে পারি, আমি যে বাড়ির সদস্য, সেই পরিবার ডাকাত কালীবাড়ির পুজোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। শুধু যুক্ত বললে কম বলা হবে কারণ, গোটা পুজোর দায়িত্বভারই আমাদের পরিবারের। ঠাকুর্দা, বাবার পর আমি এখন সেই ১২৮ বছর পুরনো পুজোর দায়িত্বে।

পুরনো দিনের ডাকাত বলতে সাহিত্য-উপন্যাস-গল্পে ভবানী পাঠক, রঘু ডাকাত, দেবী চৌধুরানীর নাম বারবার উঠে এসেছে। আমরা যে ‘ডাকাতিয়া কালীপুজো’ করি, সেটি শুরু করেছিলেন এক ডাকাতেরই পালিত ছেলে। বর্তমানে যে রাস্তাটি মনোহরপুকুর রোড বলে খ্যাত, তা ওই ডাকাতেরই নামে। ‘মনোহর ডাকাত’। আমি শুনেছি, পুরনো বাংলার ডাকাতরা যেমন হতেন, তেমনই ছিলেন এই মনোহর বাগদি।

দক্ষিণ কলকাতার পূর্ণ দাস রোডের উপরে যেখানে আমাদের বাড়ি বা মন্দির, সেখানে ১০০-১৫০ বছর আগে একটা খাল আর ঘন জঙ্গল ছাড়া কিছুই ছিল না। সেখানেই নিজের ডেরা তৈরি করেছিলেন মনোহর ডাকাত। নিজের দল তৈরি হওয়ার পর মা শক্তিকে পুজো করতেন তিনি। কষ্টি পাথরের মা কালীর প্রতিমা তৈরি করে মনোহর ডাকাত পুজো শুরু করেন। মনোহর ডাকাত বিশ্বাস করতেন, মাকে পুজো করে ডাকাতি করতে বের হলে, তাঁদের শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। তাঁরা যে কাজের জন্য যাচ্ছেন, মায়ের আশীর্বাদে সেই কাজে সফল হবেন। তাই তাঁরা মাকে সর্বশক্তিমান বলে মনে করতেন।

মনোহর বাগদি অবিবাহিত ছিলেন। একটি ছোট্ট ঘরে তাঁর বৃদ্ধা কাকিমার সঙ্গে থাকতেন। তাঁর ঘরের লাগোয়াই ছিল কালী মন্দির। গাছের তলায় কষ্টি পাথরে তৈরি মাকে পুজো করতেন মনোহর বাগদি। কালীঘাটের মন্দিরে সেই সময় বহু মানুষ আসতেন। এখন যেটা আদি গঙ্গা, তা আগে বিশাল নদী ছিল। নৌকা পথে পুণ্যার্থীরা মন্দিরে আসতেন। মনোহর ডাকাতদের দলবল সেই পুণ্যার্থীদের মালপত্র লুট করতেন এবং সোনা-রুপো-মুক্তোর গয়না এবং দামী দামী সামগ্রী এনে মায়ের পায়ে নিবেদন করতেন। লুটের সামগ্রী শুধু নিবেদন নয়, চলত ভয়ঙ্কর নরবলি। আমি শুনেছি, নরবলি দেওয়ার পর আশপাশের গাছগুলিতে মু- ঝুলিয়ে রাখা হতো। মায়ের কাছে সেই বলির মাংস উৎসর্গ করা হতো।

বিশালদেহী মনোহর ডাকাত এবং তাঁর দলবল ছাড়া এই জঙ্গলে কারও প্রবেশাধিকার ছিল না।মনোহর ডাকাত যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তিনি তাঁর পালিত ছেলে হারাধন বাগদিকে বলেছিলেন, সে যেন একটা মন্দির তৈরি করে। আর সেই মন্দিরেই যেন ওই কষ্টি পাথরের প্রতিমাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। হারাধন বাগদি একটি মন্দির তৈরি করে, সেখানে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন।

এরপর হারাধন বাগদির বংশই সেই মন্দিরের দেখাশুনা করত। এখন মানুষ যে মন্দিরটি দেখেন, সেটি ১৯৮১ সালে গড়ে তোলেন কামাখ্যাচরণ মুখোপাধ্যায় নামে একজন সাধু। মায়ের নিত্যপুজোর ভারও নেন তিনি। সেই সময় নরবলিতে রাশ টানা হলেও, লাগাতার পশুবলি হতো। মন্দির চত্বরেই একটি শিব মন্দির রয়েছে। শুনেছি, তাঁর নীচেই ওই সাধুকে সমাধিস্থ করা হয়।

এরপর এই এলাকায় সভ্যতার বিকাশ হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার এখানে ঘর-বাড়ি তৈরি করে। সেই সময় এক ব্রিটিশ সাহেব আমার ঠাকুর্দা কালীভূষণ ভট্টাচার্যকে বলেন, এই মন্দিরের পুজোর দায়িত্ব নিতে। পাশাপাশি তিনি মন্দিরটির সংস্কারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আমার ঠাকুমা চপলাবালাদেবী পুজো করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে মন্দিরের সংস্কার শুরু হয়। আগে যেখানে প্রতিমা ছিল, সেখান থেকে বর্তমান জায়গায় নিয়ে আসা হয়। ঠাকুর্দার পর আমার বাবা কান্তিভূষণ ভট্টাচার্য মন্দিরের সেবায়েতের দায়িত্ব পান। তাঁর থেকে পাই আমি। নরবলি বা পশুবলি-দুটোই এখন অতীত।

এখন চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতি অমাবস্যায় পুরোহিতরা এসে পুজো করেন। কালীপুজোয় যতক্ষণ অমাবস্যা থাকে, ততক্ষণ পুজো চালু থাকে। বাঙালি-অবাঙালি মানুষের ভিড়ে এই ডাকতিয়া কালীবাড়ি অন্য রূপ নেয়। গগন ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ঘটে ফুল চড়িয়ে পুজো করতেন। 
managed wordpress hosting

সময়নিউজ২৪.কম/ বি এম এম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *