চরাঞ্চলের মানুষদের বৈচিত্রহীন জীবন চিত্র

রাজশাহী প্রতিনিধি:

সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের অন্তরগত দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবন ধারা। উন্মুক্ত বিরান প্রান্তরে বৈচিত্র হীন জড় জীবন যাপন করে চলেছে তারা যুগ-যুগ ধরে। এখানে নেই ভাল কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নেই যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেই ভাল হাট বাজার, নেই চিকিৎসা কেন্দ্র। তার পরেও তারা সেখানেই বাস করছে ঝড়, জলোচ্ছাস, অতি বৃষ্টি, অনা বৃষ্টি, নদী ভাঙ্গন আর বন্যাকে সাথী করে।

বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম, পাকুড়িয়া ও গড়গড়ি এই তিন ইউনিয়নের আংশিক এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল পদ্মার চরাঞ্চল। পরবর্তিতে চকরাজাপুরকে আলাদা ইউনিয়ন হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে নির্বাচনী ওয়াদা পুরণ করেন তিন-তিনবার নির্বাচিত স্থানীয় সাংসদ ও বর্তমান সরকারের মাননীয় পররাষ্ট্র পতিমন্ত্রী আলহাজ শাহরিয়ার আলম।

বর্তমানে এই ইউনিয়নে বাস করেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। যাদের জীবনের কোন বৈচিত্রই নেই। কিন্তু এরা মরুভূমির বেদুঈনও নয় ! তারা চাষ করে চরের জমি। নিজের চাহিদা মিটিয়েও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি করে ধান, পাট, গম, আলু, টমেটো, পটল, আখ, মিষ্টি কুমড়া,পেপে, লাউ-সহ নানা প্রবার সবজি এবং ডাল জাতীয় ফসল। চরের পলি মাটি পড়ায় প্রতি বছর এখানে উৎপাদন হয় হাজা-হাজার মন রসুন পেঁয়াজ।

চরাঞ্চলের লোকজন জানান, এ অঞ্চলে উৎপাদনের সম্ভার দেখে এক সময় হামলা হয়েছে বর্গীদের। গত ২০০১ সালে বহুল আলোচিত সীমান্ত এলাকার ত্রাস পান্না ও লালচাঁন বাহিনীর দৃষ্টি পড়ে এই অঞ্চলের ফসল আর মানুষের উপর। নিরাপত্তাহীন এই মানুষ গুলো হালের বলদ, ফসল আর জীবন রক্ষা করতে গিয়ে কখনও বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে চরের মাটিতে আবার কখনও বা শশকের মতো ছুটেছে চরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন নারী পুরুষ খুন হয় এইসব শসস্ত্র বর্গীদের হাতে। তার পরেও তারা সেখানেই বসবাস করছেন মাটির মায়ায়। তবে বর্তমানে এসব বাহিনী আর নেই। দুই বাহিনীর প্রধান র‌্যাব ও পুলিশের হাতে ক্রসফায়ারে মারা যাবার পর এখন চরাঞ্চলের মানুষ অনেকটায় স্বাধীন ।

সরেজমিন চরাঞ্চলের গিয়ে মজিদ দেওয়ান, পাঞ্চু শেখ, ফজলু মাষ্টার, কালু ব্যাপারী,গোলাম মোস্তফা ও রহমান মেম্বরের সাথে কথা বললে তারা জানান, বর্তমান সাংসদ চরাঞ্চলকে আলাদা ইউনিয়ন করে দিলেও চরাঞ্চলের ছেলে-মেয়েদের লেখা পড়া করার জন্য এখানে নেই কোন ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাতে গোনা এক দুইটা প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখানে ভালো কোন শিক্ষককে পোষ্টিং দেয়া জায়না। আর দিলেও তারা তদবির করে অন্যত্র বদলি নিয়ে চলে যান। এখানে নেই ভাল কোন হাট বাজার, নেই রাস্তা-ঘাট, নেই চিকিৎসা কেন্দ্র, নেই বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সু-ব্যবস্থা। আধুনিক জীবন চেতনার কোন স্পর্শই তাদের নাড়া দেয়নি। একটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও এবার বন্যায় নদী গর্বে যাওয়া সম্ভাবনা লক্ষ করে সেটিকে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন।

চরের মজিবর মাষ্টার বলেন, বাঘার পদ্মার চরে ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত এমন একটি সময় ছিল যখন লালচাঁন এবং পান্নার অত্যাচারে মানুষ ঘুমাতে পারতো না। তারা প্রকাশে হালের বলদ, মহিষ, নারীদের গলার চেইন-সহ নগদ অর্থ লুট পাট করতো। তিনি জানান, বর্তমানে এই দুই বাহিনীর প্রধান পান্না ও লালচাঁন র‌্যাব এবং পুলিশের ক্রস ফায়ারে নিহত হলেও তাদের সহকর্মীরা এখনও জীবিত। বিধায়, তাদের মধ্যে সব সময় আতঙ্ক কাজ করে।

চরাঞ্চলের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগ নেতা আজিজুল আজম বলেন, চরের খাসজমি ভূমিহীন কৃষক এবং নদী সিকন্তি পয়স্তিদের মধ্যে বন্টনের লক্ষে কয়েক বছর পূর্বে সরকারী সারভেয়াররা দেয়াড়া সেটেল্টমেন্টের নামে দফায় দফায় জরিপ করলেও খাস জমি বিষয়ক কোন সমস্যাই অদ্যবধি সমাধান হয়নি। তবে চরকে আলাদা ইউনিয়ন করায় পূর্বে যে কোন সময়ের চেয়ে এখন মানুষ নানা দিক দিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাওবো) থেকে দুইশ কোটি টাকা ব্যায়ে নদী ড্রেজিং করার অনুমোদন পাশ করা হয়েছে। এটি সম্পন্য হলে চরের মানুষ বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এতে করে একদিকে উপকৃত হবেন অত্র অঞ্চলের মানুষ , অন্যদিকে লাভবান হবেন সরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *