দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষা জরুরী – সহযোগী অধ্যাপক সামিউল ইসলাম

দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে আয়েশী জীবন কাম্য নয়। দুর্নীতি মানুষের মনুষ্যত্বকে কালিমা লেপন করে। ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়ে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল ইসলাম বলেন, এই মুহুর্তে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচাইতে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে, এর পরের অবস্থান প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ভূমি প্রশাসনে। সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। আবার সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি রোধ একান্ত জরুরী। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী লোকেরাই যদি দুর্নীতিকে আশ্রয় নেয় তাহলে সরকারের পক্ষে তা রোধ করা খুবই কঠিন।

 

আমাদের বড় শক্তি হচ্ছে আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ। এই জনগণের সম্মলিত প্রয়াশেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। নৈতিক শিক্ষা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা এই দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব। তাছাড়া নিজেদের মাঝে আত্মসচেতনতা তৈরি করতে না পারলে কোনোভাবেই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবেনা।উন্নয়ন এবং সুশাসন এর মাঝে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। আমরা যদি টেকসই উন্নয়নের কথা বলি তাহলে আগে আমাদেরকে ভাবতে হবে সুন্দর একটি শাসন ব্যবস্থার। সেই শাসন ব্যবস্থা যদি গণতান্ত্রিক হয়, সেখানে স্বচ্ছতার একটা জায়গা থাকে। কারণ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকে, আর জনগণের অংশগ্রহণেই দুর্নীতি রোধ করতে পারে। তাছাড়া সেখানে জবাবদিহিতা থাকে।

 

আমরা যদি উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে চাই তবে সকল ক্ষেত্রেই সৎ ও যোগ্য লোকদের অধিষ্ঠিত করতে হবে। বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিশন হচ্ছে “ডিজিটাল পদ্ধতি” অনুসরণ করা। তথ্য প্রযুক্তিসহ সকল প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা আনায়ন ও দুর্নীতি হ্রাস করতে ডিজিটালাইজেশন সহায়তা করবে। আমরা যদি লক্ষ্য করি দেখতে পাই যে অতীতে যেকোনো কাজের টেন্ডার বিষয় নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা হতো। যা ই-টেন্ডার চালু হওয়ার পর এই টেন্ডার সংক্রান্ত দুর্নীতির বিষয় অনেক কমে গেছে। তবে তাই বলে দুর্নীতি পুরোপুরি হ্রাস পায় নি। প্রতিটা কাজের টেন্ডার হওয়ার পর এর রক্ষণের জন্য একজন বা একাধিক তত্ত্বাবধায়ক থাকতে হবে। সেই সাথে কাজের দায়িত্বগুলো যথাযথ সম্পাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে সমন্বিত নীতিমালা ঠিক রাখতে হবে।

 

আমাদের দেশে দুর্নীতি বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে তা হল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতি বিষয়ে কাজ করে। তারা যে কাজটি করে তা হলো “তরুণদের সাথে নিয়ে কাজ করা”। তাদের একটি “ইয়েস গ্রুপ”, যেখানে তরুণদের মাঝে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাগরণ তৈরি করা হয়। মনে রাখতে হবে জনগণকে সচেতনতার জন্য সবার আগে যুবসমাজকে জাগাতে হবে। সকল বাধা-বিপত্তি, অনৈতিকতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস রাখে কেবল এই যুবসমাজরাই। বড় ধরণের পরিবর্তনের জন্য এই যুবসমাজের অংশগ্রহণ জরুরী। বর্তমানে আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখছে আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ দুর্নীতি মুক্ত হবে।

 

একটা বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করতে হলে যেটা দরকার হয় তা হচ্ছে জনমত, সাধারণ মানুষের সমর্থন। দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জনমতই পারে দুর্নীতিকে চিরতরে না বলতে। আর জনমতগুলো তৈরিতে আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশ্রহণে দুর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সেমিনার, কর্মশালাগুলো সমাজ এবং রাষ্ট্রের মানুষদের চিন্তা ভাবনাতে পরিবর্তন ঘটাতে যথার্থ ভূমিকা রাখবে। কারণ এইসব কর্মসূচীতে যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়, তা শোনার জন্য শ্রোতা থাকে। এছাড়া শ্রোতাব্যক্তিরা এসব কর্মসূচীরগুলোর মাধ্যমে একটি যুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। আর যুক্তিবাদী মানুষ কখনোই অন্যায় এবং দুর্নীতিকে সমর্থন করবে না।

 

আমাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের মালিকানা আমাদের দেশের বিদ্যাপীঠগুলোর শিক্ষার্থীদের হাতে। তাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিকদের হাতে সঠিক বীজ বপন করতে হলে প্রয়োজন তাদের সঠিক মূল্যবোধ শেখানো। আমি মনে করি বিদ্যাপীঠগুলোতে দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক অনুষ্ঠানগুলো সঠিক মূল্যবোধ শেখাতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।

 

অতীতের চাইতে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতি প্রতিরোধে বহুলাংশে অগ্রসর হয়েছে। ভবিষ্যত বাংলাদেশ বিনির্মাণে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও বেশি গতিশীল হতে হবে। কারণ আমাদের সাধারণ মানুষের আশা এবং আকাঙ্খার জায়গায় দুর্নীতি দমন কমিশন পিছিয়ে আছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজের পরিধিকে সম্প্রসারিত করতে হবে। কারণ বড় জনসংখ্যার এই দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক কাজ করলে চলবে না। দেশের যে কোনো প্রান্তে এই দুদকের কার্যক্রম দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। এইজন্য সরকারের উচিৎ এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আরও বেশি সুনজর দেওয়া।

 

পাদটিকা: সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল ইসলামের বাড়ী কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায়। তিনি শাবিপ্রবি হতে ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষে পলিটিক্যাল স্টাডিজ এন্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ হতে স্নাতক, ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ হতে স্নাতকোত্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে ২০০৮-০৯ বর্ষে “স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে ক্ষমতায়ন, অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব” থিসিস শিরোনামে এম.ফিল করে ২০১৪ তে ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *