দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রী সভার শুভ যাত্রা শুরু হলো। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেনজাতিরজনকের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রী সভায় অধিকাংশই নতুন মুখ আর তারণ্যেও আগমনও ঘটেছে বটে। আওয়ামীলীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা আর জোটের শরীকরা মন্ত্রী না পাওয়া নিয়েও নানা কথা শুনা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন এটা ‘শেখ হাসিনার চমক’। তবে আসল চমক হবে নির্বাচনী ইশতেহার যথাযোথ ভাবে বাস্তবায়ন। সুশাসন কায়েম, দুর্নীতি রোধ করা, আর্থ-সামাজিক খাতে চলমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখাই হবে নতুন সরকারের বড় কাজ।

গত একদশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশকে অনেক দুর এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর্থ-সামাজিক খাতের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটেছে। আমরা এরই মধ্যে দেখেছিল যে, ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে ২০২১ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০১৫ সালেই তা অর্জিত হয়েছে। বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সুখী, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এটি এই সরকারের অন্যতম উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক এজেন্ডাও। সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নে এ সরকার কাজ করছে। সমৃদ্ধ দেশ গড়তে গত এক দশকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবশে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, দারিদ্রমোচন, সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় অর্জন হয়েছে। নবজাতক ও শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করতে পেয়েছে।

গত একদশকে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। মাথাপিছু আয় ও ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। সম্ধৃসঢ়;দ্ধ হয়েছে নগরায়ন ও গ্রামাঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অগ্রনী ভুমিকা পালন করছে এই সরকার। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে একেবারেই প্রথম সারিতে। নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের অগ্রগতি লক্ষণীয়।
নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ আগের থেকে এখন অনেক এগিয়ে। এবার আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শেখ হাসিনা ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহনের ঘোষনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি। পেশিশক্তির ব্যবহার ও অপরাধের শিকড় হচ্ছে দুর্নীতি। যার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে অবক্ষয় বা পচন শুরু হয় এবং অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন প্রভৃতি কোনো ক্ষেত্রেই ইস্পিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ মুখ্য হলেও তা শুধু সরকারের দায় নয়, জনগণেরও দায় রয়েছে। আমরা মনেকরি দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া হবে’।

তিনি আরো বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্ম পরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী করে আধুনিকায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায়এবং প্রায়োগিক ব্যবহারে সহযোগিতা করবে সরকার। দুর্নীতিবাজরা দেশ ও জাতির শত্রু। রাষ্ট্রকে আগে চিহ্নিত করতে হবে কোথায়, কোন খাতে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। দেখা যায়, সরকারি সেবাধর্মী খাতে বেশি দুর্নীতি হয়। কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগেও দুর্নীতির কথা জানা গেল। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সেবাধর্মী খাতগুলোতে মানুষের চলাচল বেশি থাকে। তাই দুর্নীতিও বেশি হয়। এক বছরের দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব। সেবা খাতে বছরে দুর্নীতি হয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতি হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। ঘুষ-দুর্নীতি হয় বাজেটের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপির ০ দশমিক ৬ শতাংশ। উচ্চ আয়ের তুলনায় নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর দুর্নীতি বেশি হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দুর্নীতি সহনশীল মাত্রায় আনা সম্ভব। যদিও গোটা বিশ্বই এ সমস্যার মোকাবেলা করছে। হিসাবমতে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার লুটপাট হয়। এর মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতি হয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্বময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণার কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও দুর্নীতিবাজরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই দুর্নীতির বিরুদ্ধে। যদিও অধিকাংশ মানুষ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চায় না। এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দুদকে (দুর্নীতি দমন কমিশন) অভিযোগ দাখিল করে। দুদক নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও সরকারের সদিচ্ছায় দুদকের প্রতি এখনও মানুষের আস্থা রয়েছে।

সরকার দুদকের আইনি ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মামলা ছাড়াই দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার করতে পারবে- এ ক্ষমতা দুদককে দিয়েছে। তবে ঘুষ-দুর্নীতি থেকে দুদকের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মুক্ত করতে হবে। নতুবা এ আইনের অপব্যবহার হতে পারে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক দল চাই, দুর্নীতিমুক্ত নেতা চাই, দুর্নীতিমুক্ত সরকার চাই, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন চাই। সরকারি-আধা সরকারি অফিস থেকে দুর্নীতি দূর করতে পারলে জাতি দুর্নীতির অভিশাপ থেকে অনেকাংশেই রেহাই পাবে। আইনের দোহাই দিয়ে অথবা গ্রেফতার করে সরকারি অফিস থেকে সাময়িকভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুফল পাওয়া যেতে পারে। এইতো গেলো দুর্নীতির কথা। সুশাসন নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। সুশিল সমাজ আর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সুশাসন নিয়ে নানা কথা শুনা যায়।

মনে রাখা দরকার যে, সুশাসন মানবাধিকারকে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন ও সম্মান প্রদর্শন করে। এ শাসনব্যবস্থা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। সুশাসনের মাধ্যমে সব দায়িত্ব পালনে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে শুদ্ধাচার ও ন্যায্যতার ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা একটি ব্যাপক বিষয়। যথোপযুক্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচর্যার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। সুশাসনে মত প্রকাশের ও পরামর্শ দেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে বলে এ পরিবেশে শক্তিশালী সুশীলসমাজ গঠিত হতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশে দক্ষতাসম্পন্ন সুশীলসমাজ রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক পরামর্শ প্রদানে সক্ষম হয়। যারা শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন তারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকেন বলে অনেক সময় জনমতের গতি- প্রকৃতি সঠিকভাবে আঁচ করতে পারেন না। ফলে শক্তিশালী সুশীলসমাজ নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় যথাযথ ভূমিকা প্রতিপালন করতে পারে।

লেখকঃ

বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফএফ
ফাউন্ডেশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *