ধনকুব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ইন্সপেক্টর’র কর্মস্থল যশোরে ২৫ দিনই ঢাকাতে থাকেন: মাদক ব্যবসা থেকে বাঁচাতে আপন ভাইকে অস্বীকার

উজ্জ্বল রায়, নিজস্ব প্রতিবেদক:

তিনার কর্মস্থল যশোর হলেও মাসের ২৫ দিনই তিনি রাজধানীতে থাকেন মাদক ব্যবসা থেকে বাঁচাতে আপন ভাইকে অস্বীকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ইন্সপেক্টর হেলালউদ্দিন ভূঁইয়ার ও তার স্ত্রী মাহামুদা সিকদার ওরফে মাহামুদা হেলালসহ নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ ওঠে গত বছর। একই বছরের ২৯ জুলাই দুদকে অভিযোগ জমা পড়ে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে এবার সন্ধান পেলো দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখা-২।

 

তারা জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে হেলাল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিলেছে। গত ২৮ আগস্ট দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন তাদের নোটিশ পাঠিয়েছেন। ২১ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পদের হিসাব দুদকে জমা দিতে বলা হয়েছে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, হেলাল তার স্ত্রী মাহমুদা, বড় ভাই বেলাল হোসেন ভূইয়া, ছোট ভাই আজাদ হোসেন, ভাগ্নে মো. জায়েদ ও ফুফাত ভাই মুশফিকুর রহমানের নামে সম্পদ গড়েছেন।

সন্দেহের জের ধরে হেলালের অর্থের উৎস সন্ধানে নেমে ব্যাংক এশিয়া, ওয়ান ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকের তিনটি হিসাব গুরুত্ব পাচ্ছে। স্মার্ট অ্যাড-এর নামে ব্যাংক এশিয়ায়, সৌরভ ক্রাফট লিমিটেড-এর নামে ওয়ান ব্যাংকে এবং জামিল ফ্যাশন-এর নামে এনসিসি ব্যাংকের হিসাবগুলো বিভিন্ন সময়ে খোলা হয় বলে জানিয়েছে দুদকের ঊর্ধ্বতন সূত্র। এসব ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের তথ্য আছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া তার ভাইয়ের নামে বার (মদের দোকান) চালান, এই অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। নিজেকে বাঁচাতে সেই ভাইকেও অস্বীকার করেছেন তিনি। তিনার কর্মস্থল যশোর হলেও মাসের ২৫ দিনই তিনি রাজধানীতে থাকেন। মোহাম্মদপুরে নবোদয় হাউজিংয়ে রয়েছে তার নিজস্ব বাড়ী। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি হেলাল ও তার স্ত্রী মাহমুদা সিকদারের সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে।

 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে ‘ধনকুবের’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই দম্পতিকে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকলেও নেপথ্যে থেকে ‘লেক ভিউ রিক্রিয়েশন ক্লাব লিমিটেড’ পরিচালনায় আরও ৫ জনের সঙ্গে যুক্ত আছেন হেলাল। রাজধানীর গুলশান এভিনিউয়ের ৩০ নম্বর রোডের ৬০সি নম্বর বাসার ৫তলা ভবনজুড়ে পরিচালিত এই বার ‘টপ রেটেড’ হিসেবে পরিচিত। শুরুতে গুলশান-১ নম্বরের একটি ভবনের ১৯তলায় ছিল এটি।

সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় বারটির মালিকানায় সরাসরি যুক্ত হতে পারেননি হেলাল। তাই দায়িত্ব দিয়েছেন ছোট ভাইকে। তার নাম মো. আজাদ হোসেন। তবে হেলালের দাবি, আজাদ নামে তার কোনও ভাই নেই। এর বিপরীতে আজাদ অবশ্য জানান, হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া তার আপন ভাই। আজাদ নিজেকে রেডিও স্টেশন স্পাইস এফএম’র মেইনটেনেন্টস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচয় দেন। সেখানে ৩ বছর ধরে কর্মরত আছেন বলে জানান তিনি। জাতীয় পরিচয়পত্রে দেওয়া তথ্য বলছে, আজাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বড়কান্দি (মধ্যাংশ)। বাড়ির নাম ‘ভূঁইয়া বাড়ি’। বাবা আলী আহম্মদ ভূঁইয়া এবং মা মোসাম্মৎ সামছুন নাহার। জাতীয় পরিচয়পত্রে আজাদের পেশা ‘ছাত্র’ উল্লেখ আছে। এই একই ঠিকানার আলী আহম্মদ ভূঁইয়া ও সামছুন নাহার দম্পতির ছেলে হেলাল।

 

জানা গেছে, ৬ ভাইবোনের মধ্যে হেলাল চতুর্থ। আজাদ সবার ছোট। অন্য ভাইবোনেরা হলেন আমিনুর রসুল ভূঁইয়া, ইফাত আরা হাসি, বেলাল হোসেন ভূঁইয়া ও বায়েজীদ আহমেদ ভূঁইয়া। লেক ভিউ রিক্রিয়েশন ক্লাবটি পরিচালনা করেন ৬ সদস্যদের পরিচালনা পর্ষদ। এতে আজাদ ছাড়া বাকি ৫ জন হলেন সাখাওয়াৎ হোসেন, মো. শমসের হোসেন টিপু, মুক্তার হোসেন, ফারহানা হোসেন ও মো. আসাদুজ্জামান খান। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস-এর তথ্য বলছে, লেক ভিউ রিক্রিয়েশন ক্লাব লিমিটেডের অথরাইজড শেয়ার ক্যা’পিটাল হলো ১ কোটি টাকা। এর ডিভিডেন্ড শেয়ারের প্রতিটির দাম ১ লাখ টাকা।

সাধারণ শেয়ারের প্রতিটির দাম ১০০ টাকা করে। ক্লাবের ৪ জন শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে শমসের হোসেন টিপু ২ হাজার ৫০০, আজাদ হোসেন ২ হাজার, মুক্তার হোসেন ৫ হাজার এবং ফারহানা হোসেন ৫০০ ডিভিডেন্ড শেয়ারের মালিক। হেলালের ভাই আজাদের সঙ্গে কথা বলে অনেক প্রশ্নের জবাব মেলেনি। ক্লাবের ২ হাজার ডিভিডেন্ড শেয়ারের টাকা কোথা থেকে এসেছে, জানা যায়নি। টাকার উৎস তার বড় ভাই হেলাল কিনা, এরও জবাব পাওয়া যায়নি তার কাছ থেকে। তবে আজাদ তার ভাই হেলালকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদে ছিলাম। সম্প্রতি একটি কাগজ এনে সই দিতে বলা হয়। তবে সেখানে কী লেখা ছিল, জানা নেই।’

গত ২৮ আগস্ট দেওয়া দুদকের নোটিশ পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে হেলাল বলেন, ‘নোটিশের কথা শুনেছি। তবে হাতে আসেনি।’ দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে বিপুল পরিমাণ অ’বৈধ সম্পদের মালিক আপনি এমন প্রশ্নের জবাবে হেলাল বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আছে। আর ওই দ্বন্দ্বের কারণেই কিছু লোক দুদকে অভিযোগ জমা দিয়েছে। আর এই অভিযোগকে ভিত্তি করেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

 

দুদকের অনুসন্ধান মিথ্যা প্রমাণিত হবে বলে দাবি করেন তিনি। নামে-বেনামে হেলালের যত সম্পদ ১. রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার সাঈদ নগরে ২৬৮২ দাগে ৫ কাঠার প্লট; ২. ফার্মগেটের (ইন্দিরা রোডে) পার্ক ভিউ রেস্টুরেন্টের মালিকানা (শেয়ার); ৩. কারওয়ান বাজারে (৩৩ নং) আবাসন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কাদামাটি প্রপার্টিজ লিমিটেডের মালিকানা; ৪. বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘বি’ ব্লকে ৫ কাঠার প্লট; ৫. ইস্টার্ন হাউজিংয়ে (আফতাব নগর) ৫ কাঠার প্লট; ৬. মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ে (বাড়ি-২৪, সড়ক-১এ, ব্লক-বি) ৪ হাজার বর্গফুটের ২টি ফ্ল্যাট; ৭. মিরপুর ডিওএইচএস শপিং কমপ্লেক্সে ৭টি দোকান; ৮. কুমিল্লার কাঠেরপুল, উত্তর বেইস কোর্স, ক্যামেলিয়া হাউজে স্বপ্ন মা’দকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র; ৯. কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার লুটেরচরে তিতাস ফিশিং প্রজেক্ট (হেলালের ফিশিং প্রজেক্ট নামে পরিচিত); ১০. লুটেরচরে ১৫ বিঘা জমি (বাজার মূল্য ৪ কোটি টাকা); ১১. লুটেরচরে একটি ইটভাটা এবং ১২. ব্যক্তিগত গাড়ি টয়োটা প্রিমিও-এফ (ঢাকা মেট্রো-গ-২৭-৭২৫০)। ধনকুব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ইন্সপেক্টর’র কর্মস্থল যশোরে ২৫ দিনই ঢাকাতে থাকেন: মাদক ব্যবসা থেকে বাঁচাতে আপন ভাইকে অস্বীকার করেছে।

 

সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *