All-focus

নওগাঁর ধামইরহাটে ৪০টি বাড়ি-ঘরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ

শহিদুল ইসলাম , নওগাঁ :
নওগাঁর ধামইরহাটে ঘুমন্ত আদিবাসি ও মুসলিমদের ৪০টি বাড়ি-ঘরে হামলা, ভাংচুর ও পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ঘটনায় ৬ আদিবাসি আহত হয়েছেন। রবিবার রাত ১২টার দিকে উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের বস্তাবর কাগজকুটা গ্রামের পুকুর পাড়ে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

এই অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনাটি জানতে পেরে বিজিবি-১৪ ব্যাটলিয়নের স্থানীয় বস্তাবর বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা দ্রুত ঘটনা স্থলে যান। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারিরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

এতে আদিবাসিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়ায় এলাকা ছাড়া হয়েছেন আদিবাসি পরিবার। অনেকেই খোলা আকাশের নীচে মানবেতন জীবন যাপন করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একই এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকী নামে এক ব্যক্তি উপজেলা ভ’মি অফিস থেকে লীজ নেন। এরপর হাত বদলে বস্তাবর গ্রামের মোশারফ হোসেন নামে এক প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা প্রায় চার বছর আগে কাগজকুটা পুকুরসহ প্রায় তিন বিঘা জমি কিনে নেন বলে দাবি করেন। এদিকে ওই সম্পত্তি সরকারি খাস সম্পত্তি দাবি করে প্রায় চার মাস আগে এলাকার ভ’মিহীন ৪০টি আদিবাসি ও মুসলিম পরিবার টিনের ছাউনি এবং বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। এ ঘটনায় নিয়ে একাধিক মামলাও চলমান রয়েছে। এমতাবস্তায় রবিবার মধ্য রাতে ঘুমন্ত ভূমিহীন মানুষদের উপর লাঠিসোড়া নিয়ে শতাধিক লোকজন হামলা চালায়। এ সময় ঘরবাড়িতে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অগ্নিসংযোগ ধান, চাউল, কাপড় চোপড়, হাঁস-মুরগী, ছাগল, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন পুড়ে যায়।

এই অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনাটি জানতে পেরে বিজিবি-১৪ ব্যাটলিয়নের আওয়ায় স্থানীয় বস্তাবর বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা দ্রুত ঘটনা স্থলে যান। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারিরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
নির্যাতনের শিকার মৃত মোজাফ্ফর রহমানের বিধবা স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, সন্ত্রাসীদের হাতে ধারালো বড় হাসুয়া, কুড়াল, তীর ধনুক, লাঠি ও হাতে পেট্রোল নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় তাদের ব্যাপক মারপিট করাসহ বাড়ি-ঘরে আগুন ধরে দেয়া হয়। এছাড়া থালা-বাসন ও চাউল, নগদ টাকা লুটপাট করা হয়।

মৃত ঘুটু পাহানের স্ত্রী শান্তি পাহান জানান, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এই নৃসংশহামলায় সেখানে বসবাসরত ভূমিহীনরা আতঙ্কিত হয়ে পরেন। তারা দিশেহারা হয়ে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে পরেন। তাদের চিৎকার ও আগুনের লেলীন শিখায় স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে আসেন। এতে তারা জীবনে বেঁচে যান।
এ হামলায় শান্তি পাহানের হাত ভেঙ্গে যায় এবং তার ৫ বছরের ছেলে আকাশসহ ৬/৭ জন আহত হয়েছেন।

ভুক্তভোগী বিধবা মনোয়ারা বেগম, সানাউল ইসলাম, আফিজ উদ্দিন, নূরুজ্জামান, শান্তি পাহান, অধিন পাহান, লগেন পাহান ও জীবনি সহ কয়েকজন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা গত এক বছর থেকে পুকুর পাড়ে সরকারি জায়গায় বসবাস করে আসছি। কিন্তু প্রভাবশালী স্থ’ানীয় আওয়ামীলীগ নেতা মোশারফ হোসেন মাষ্টার ওই জায়গাটি নিজের বলে দাবী করে আমাদের প্রায় জায়গাটি ছেড়ে দেয়ার জন্য হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ রবিবার রাতে শতাধিক জন লোক রাতের আধারে আমাদের উপর হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মারপিট করে এবং পেট্রোল ঢেলে বাড়িঘর আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বর্তমানে আমরা খোলা আকাশের নিচে অনাহারে বসবাস করছি।

এদিকে ওই জমির দাবীদার মোশারফ হোসেন মাষ্টার সাংবাদিকদের বলেন, ওই জমিটি আমাদের দলিলকৃত। দির্ঘদিন জমিটি আমাদের দখলে ছিল। কিন্তু হটাৎ করে কতিপয় লোকজন অবৈধভাবে দখলের জন্য ছোট ছোট ঘর নির্মাণ করে। বিষয়টি নিয়ে চলতি মাসের ১০ তারিখে ধামইরহাট থানায় একটি নিজ দখলীয় জায়গায় অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি মামলা করা হয়। বিবাদমান ওই জমিতে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। যার স্মারক নং ১৬৯, তারিখ ২৬/০২/২০১৯ ইং। আদালতের আদেশ অমান্য করে তারা বসতবাড়ী নির্মাণ করেছে। তবে ওইসব বাড়ীঘরে তিনি বা তার কোন লোকজন আগুন দেয়নি এবং এর সাথে তাদের কোন সম্পৃক্তা নেই বলেও সাংবাদিকদের জানান মোশারফ হোসেন মাষ্টার ।

এ ব্যাপারে স্থানীয় আলমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, বহু বছর থেকে ওই জায়গাটা মোশারফ হোসেন মাষ্টারদের দখলে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ভূমিহীনরা সেখানে বাড়ি করে বসবাস শুরু করে। আপোষের জন্য বিষয়টি নিয়ে উভয়পক্ষকে বসা হয়েছিল। কিন্তু কোনপক্ষই ছাড় দিতে চায় না।
বিজিবি-১৪ পতœীতলার ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে: কর্ণেল খিজির খান জানান, ঘটনাটি দেখতে পেয়ে বস্তাবর বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা দ্রুত ঘটনা স্থলে যান। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারিরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এতে করে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
ধামইরহাট থানার ওসি জাকিরুল ইসলাম বলেন, ওই সম্পত্তি ব্যক্তিগত। আদিবাসিরা জোর করে দখল করে বাড়িঘর তৈরী করেন। এ নিয়ে একাধিক মামলাও রয়েছে। আগের মামলায় আদিবাসির দুই জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোন পক্ষই মামলা দায়ের করেন নি। মামলা হলে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণপতি রায় জানান, ওই সম্পত্তি আদৌও কি অবস্থায় আছে তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সময়নিউজ২৪.কম/ এ এস আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *