নওগাঁর ভালাইন গ্রামের তিন শতাধিক দারিদ্র পরিবারের গৃহবধূরা হাত পাখা তৈরী করে সংসারে ফিরে এনেছে স্বচ্ছলতা

শহিদুল ইসলাম (জি এম মিঠন) নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভালাইন গ্রাম। এ গ্রামটি এখন পাখা গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এ গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক দারিদ্র পরিবার হাত পাখা তৈরী করে সংসারে ফিরে এনেছে স্বচ্ছলতা।সেই সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন তারা। তাল পাতা দিয়ে তৈরী এ হাত পাখার চাহিদা বেশি থাকায় এখন ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে স্বল্পসুদে ঋণ এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে আরো এগিয়ে যাবেন বলে মনে করছেন এসব হাত পাখা তৈরীর কারিগররা।

জানাগেছে, নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উত্তরগ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত এ গ্রামটি ভালাইন। এ গ্রামে প্রায় ৬৫টি পরিবারের বসবাস। এ গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক নারী-পুরুষ হাত পাখা তৈরীর সাথে সম্পৃক্ত। দরিদ্র এসব পরিবার হাত পাখা তৈরীকেই এখন পেশা হিসেবে বেঁছে নিয়েছেন।

প্রায় ২৫ বছর থেকে এ গ্রামে তাল পাতা দিয়ে হাত পাখা তৈরী হয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় এ গ্রামটি এখন পাখা গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রীষ্মকালিন সময়ে বিশেষ করে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠ, আশ্বিন,কার্তিক, অগ্রহায়ন ও চৈত্রসহ কয়েকটি মাস প্রচন্ড তাপদাহ থাকে। ফলে এসময় ভ্যাপসা গরম হয়ে থাকে। এই সময় তাল পাতা দিয়ে তৈরী হাত পাখার চাহিদা বেড়ে যায়।

প্রতি বছর এ গ্রাম থেকে ঢাকা, সৈয়দপুর, রাজশাহী, পঞ্চগড়, ফরিদপুর, দিনাজপুর সহ কয়েকটি জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ পাখা সরবরাহ করা হয়ে থাকে।পাখা তৈরীর উপকরণ তাল পাতা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ এবং বিক্রির কাজ মুলত পুরুষরাই করে থাকেন। পাতা রোদে শুকিয়ে
পানিতে ভেজানোর পর পরিস্কার করে পাখার রুপ দেয়া হয়। এরপর রং মিশ্রিত বাঁশের কাঠি, সুই ও সুতা দিয়ে পাখা বাঁধার কাজটা করেন গৃহবধুরা। সংসারের কাজের পাশাপাশি তৈরী করা হয়
এ তাল পাখা।

পড়াশুনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পাখা তৈরী করে বাবা- মাকে সহযোগীতা করে থাকে। তবে পাখা তৈরীতে যে পরিশ্রম ও খরচ সে তুলনায় দাম পাননা কারিগররা। বিভিন্ন এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয় কারিগরদের। তবে স্বল্প পরিশ্রমে টাকা বিনিয়োগ করে বেশি লাভে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।

এ গ্রামের গৃহবধু আনজুয়ারা বেগম বলেন, গত ২৫ বছর আগে ভালাইন গ্রামে বিয়ে হয়ে আসেন। এরপর দরিদ্র স্বামী মুক্তার হোসেনের কাছে এ পাখা তৈরীর কাজ শিখেন। সেই থেকে এ পাখা তৈরী করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। আর এ পাখা তৈরী করে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই সন্তানকে পড়াশুনার খরচ বহন করছেন। এ পাখা তৈরী করেই সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে বলে জানান তিনি।

গৃহবধু ফাহিমা, খোরশেদা, কোহিনুরসহ কয়েকজন বলেন, পুরুষরা শুধু তাল পাতা নিয়ে এসে শুকানোর পর পরিস্কার করে দেন।এরপর আমরা সাংসারিক কাজের পাশাপাশি পাখাকে সুই-সুতা
দিয়ে সেলাই ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করি। প্রতিদিন আমরা ৫০-১০০ টা পর্যন্ত পাখা তৈরী করতে পারি।

পাখার কারিগর সাইদুর রহমান বলেন, জেলার সাপাহার ও পোরশা উপজেলা এবংচাঁপাইনবাবগঞ্জের আড্ডা ও রোহনপুর থেকে তাল পাতা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি তাল পাতার দাম পড়ে ৫টাকা। এরসাথে রঙিন বাঁশের কাঠি ও সুতা খরচ হয় দেড় টাকা।প্রতিটি পাখা তৈরীতে খরচ পড়ে সাড়ে ৬ টাকা করে। সেখানে আমরা পাইকারী বিক্রি করি প্রতি পিচ ১০-১২ টাকা। ঢাকা ও
সৈয়দপুরসহ কয়েকটি জেলায় নিজে গিয়ে পাইকারী দিয়ে আসেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা প্রতিটি পাখা বিক্রি করেন ২৫-৩০ টাকা করে। পাখা তৈরীতে যে পরিশ্রম হয় তুলনায় আমরা দাম পাইনা।

আরেক কারিগর আনোয়ার হোসেন বলেন, এ গ্রামের তিনশতাধিক মানুষ পাখা তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বিভিন্ন এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পাখা তৈরী করতে হয়। ফলে লাভের একটি অংশ চলে যায় এনজিওতে।সরকার যদি স্বল্পসুদে আমাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে কিছুটা লাভ থাকত।

মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোবারক হোসেন বলেন, পাখা তৈরীর কারিগররা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নিজেদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন করে চলেছেন। আর্থিক কারণে যেন এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগীতা প্রদান করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

সময় নিউজ২৪.কম/ বি এম এম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *