নওগাঁয় আলো ছড়াচ্ছে আশার আলো বিদ্যাপিঠ

মো.আককাস আলী, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমের সময়ে মানুষ আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়া চরম ছোয়াঁচে এই অপ্রতিরোধ্য রোগের কারণে বাধ্য হয়ে স্কুল, কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সরকার এপ্রিল থেকে অনলাইনে ক্লাস করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। শিক্ষার্থীদের আকাংখা এবং ডিভাইস সমস্যার কারণে গ্রামের শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছে না। গ্রামে শিক্ষার্থীদের সামগ্রীক পরিস্থিতি বিবেচনায় মেশকাতুল জান্নাত আখি গড়ে তোলে আশার আলো বিদ্যাপিঠ। নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার আকবরপুর ইউনিয়নের বাদতিলনা গ্রামে আখির আশার আলো বিদ্যাপিঠের কার্যক্রম সবার নজর কেড়ে নিয়েছে। আখির দাদি নারী নেত্রী আনজুমান আরার বারান্দায় ২১ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে ক্লাস করাতে ব্যস্ত দেখা যায় আখি এবং সহপাঠি ইসমত আরাকে। আত্ম-প্রত্যয়ি তরুণদের নেতৃত্বে বেশ আনন্দে পাঠ্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে শিক্ষার্থীরা।

আশার আলো বিদ্যাপিঠে অধ্যয়নরত ক্লাস ওয়ানের শিক্ষার্থী সাবরিন জাহার বলে “বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে না, আখি আপুর ডাকে আমরা এখানে আসি, পড়াশুনা করি, নতুন নতুন শব্দ শিখি, জাতীয় সংগীত শিখি। আমাদের খুব আনন্দ লাগে। আমরা এখানে বাড়ির চাইতে বেশ ভালো আছি।” ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলে “আমার পড়াশুনার আগ্রহ কমে গিয়েছিল। আখি আপুর ডাকে এখানে প্রতিদিন ক্লাসের পড়া করি। এর বাইরে ওয়ার্ড শিখি, ছবি আকিঁ, খেলাধুৃলা করি। এখানে খাতা-কলম পাওয়া যায়, মাঝে মাঝে চকলেট দেয়। বন্ধুদের সাথে খেলা করি। স্কুলের অভাব মনে হয় না।এছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে শেখানো হয়। হাত ধোয়া, মাস্ক পরাসহ অনেক কিছু শিখি।” ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মিম্মা এর মা মোকছেদা বেগমের সাথে দেখা হয়। তিনি জানালেন “করোনা ভাইরাসের সংক্রমন শুরু হলে স্কুল বন্ধ হওয়ায় তিনি সন্তানদের পড়াশুনা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ক্রমাগত বাড়িতে থেকে শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠে। আশার আলো বিদ্যাপিঠের মধ্যমে আমার সংসারে পুনরায় হাসি ফুঁটে উঠেছে। আমি এখন বাচ্চাদের পড়াশুনা নিয়ে আশাবাদি। তারা পূর্বের ন্যায় পাঠে মনোযোগ দিয়েছে। এখন আর তাদের পড়তে বলতে হয় না। এখানে নতুন নতুন শৃংখলা শিখে বাড়িতে প্রয়োগ করে আমাদেরও সংশোধন করছে।

আশার আলো বিদ্যাপিঠের পৃষ্ঠপোষক নারীনেত্রী আনজুমান আরা বলেন “করোনা ভাইরাসের সামাজিক সংক্রমন শুরু হলে আমরা গ্রাম উন্নয়ন দলের নেতৃত্বে গ্রামের সকল মানুষকে সংগঠিত করে করোনা মোকাবেলার সম্ভাব্য সকল পথ বের করি। মানুষকে সচেতন করে তুলি। লিফলেট বিতরণ, ঘন ঘন হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান, শারীরিক দুরত্ব বজায় রেখে চলা, করোনা সন্দেহ হলে পরীক্ষা করানো, বাইরে থেকে যারা গ্রামে আসছেন তাদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা, নারী-িশিশু এভং বয়স্কদের সুরক্ষায় পরিবারের সবার সতর্ক দৃষ্টি এবং কর্মহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা। এই কাজ করতে গিয়ে শিশুদের চিন্তা মাথায় আসে। তাই তো আশার আলো বিদ্যাপিঠের যাত্রা শুরু। এখানে সবাই খুব আন্তরিক এবং আনন্দের সাথে পাঠে অংশ নিচ্ছে।

আমরা প্রতি সপ্তাহে বাচ্চাদের নতুন নতুন উপহার দিয়ে থাকি।” আকবরপুর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোজাহাররুল ইসলাম জানান,আমি অভিভূত এবং আনন্দিত। এখানে শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করায় আখি এবং ইসমতারাকে আমার পক্ষ থেকে সাধুৃবাদ জানাই।আমরা সবাই মিলে করোনাকে জয় করেই ছাড়বো ইনশা আল্লাহ।” আশার আলো বিদ্যাপিঠের উদ্যোক্তা মেশকাতুল জান্নাত আখি বলে “শিশুদের সাথে থাকতে থাকতে আমার শৈশবের অনূভুতিগুলো জেগে উঠছে। শিশুরা দুরন্ত হবে না তা কি হতে পারে ? এক সাথে দুরন্তপণার মজাই আলাদা। আশার আলো বিদ্যাপিঠ দুরন্তপণারই ফসল।

এখানকার দুরন্ত শিশুদের দুর্দান্ত করে গড়ে তুলতে আমাদের শ্রম অব্যাহত থাকবে। আমরা শিশুদের মানসিক অবস্থা বুঝে পড়াশুনার কথা বলি। না পড়তে চাইলে পড়বে না। খেলতে খেলতে নতুন শব্দ শিখা, জাতীয় সংগীত চর্চা, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলে শিশুদের চেতনায় মুক্তির প্রেরণা জাগানোসহ বিভিন্ন গঠনমুলক কাজ করার ইচ্ছা আছে। এখানে শিশু শ্রেণী থেকে ৭ম শ্রেনী পর্যন্ত শিশুরা অধ্যয়নরত। বিনামূল্যে পাঠদানের মাধ্যমে শিশুদের পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে সাবান, মাস্ক এবং হোয়াট বোর্ড ও মার্কার দিয়ে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট আমাদের সহায়তা করেছেন। একজন ইয়ূথ লিডার হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা বোধ থেকেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।” উদ্যোক্তারা আশার আলো বিদ্যাপিঠের আয়োজন ক্ষুদ্র বললেও আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাট ভুমিকা রেখে চলেছে উদ্যোগটি। আমাদের বৈশ্বিক অঙ্গিকার হিসেবে মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সময়ের দাবি। এছাড়াও এখানে সচেতনতা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ৩ ও ৪ লক্ষ্যার্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তৃণমূলে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাব্রতিদের এমন উদ্যোগ একদিকে করোনা সহনশীল গ্রাম গড়ে তোলা এবং এসডিজি বাস্তবায়নে সহায়ক ভুমিকা রাখছে। গ্রামের মানুষের সম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ অর্জন হোক আমাদের সবার অঙ্গিকার।

 

সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *