নওগাঁ সহ সারাদেশ থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে চিরচেনা সেই খেজুর গাছ ও রস

 Hostens.com - A home for your website

শহিদুল ইসলাম (জি এম মিঠন) নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ

আজব এক জায়গাঁর নাম পৃথিবী। এখানে চলছে অতীত ও বর্তমানের রেষারেশি। এরেষারেশির যাতাকলে পড়ে অনেক কিছুই সৃষ্টি হচ্ছে, আবার ধ্বংস ও হচ্ছে অনেক কিছুই। আজব এই পৃথিবীর মধ্যে ষড় ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ন্যায় বছরের একেক সময় একেক রুপ ধারন করে আমাদের বাংলাদেশ ও। কালের পরিক্রমায় প্রতি বছরই হাজির হয় শীতকাল।

শীতের সকালে বিভিন্ন গাছ-গাছড়া ও ঘাসের ডগায় শিশির ভেজা মুক্তকণা জানান দিচ্ছে শীতের আভাষ। বছরের এ সময়টি বিভিন্ন রকমের প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে হাজির হয় এই ঋতু। তার মধ্যে অন্যতম হলো খেজুর গাছের রস।

কিন্তু কালের বিবর্তনে নওগাঁ সহ সারাদেশ থেকেই হারিয়ে যেতে চলেছে চিরচেনা সেই খেজুর রস। শীতের সাথেই রয়েছে, খেজুর রসের এক অপূরুপ্ত সম্পর্ক। শীত মৌসুমের শুরুতেই দেশের গ্রাম সহ শহর গুলোর ( বিশেষ কিছু গাছী হিসাবে পরিচিত) মানুষরাই খেজুর গাছ ছিলানো (কাটাই) নিয়ে ব্যস্ত পয়ে পড়েন, কে কার আগে রস সংগ্রহ করতে পারে এ নিয়ে ও চলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগীতা।

বিশেষ করে বছরের একটি সময় এ শীত মৌসুমে গাছীদের মনে আনন্দর বন্যা বয়ে যেত। শীতের ভোরে খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা মহাব্যাস্ত হয়ে পড়ত। গাছিরা তাদের কোমরে মোটা রশি বেঁধে গাছে ঝুলে ঝুলেই সংগ্রহ করত খেজুর গাছের রস। এছাড়া বিশেষ করে গ্রাম গুলোতে খেজুর রস সংগ্রহ করে নতুন আমন ধানের চালের গুরোর  পিঠা, ভাপা, পুলি ও পায়েশ তৈরীর ধুম পড়ে যেত গ্রাম গুলোতে।

এছাড়া ও রস দিয়ে করা হয় খেজুর রসের গুড়। খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরী মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া ও মুড়ি খাওয়া প্রায় প্রতিটি মানুষের শীত মৌসুমে প্রিয়। তবে খেজুর রসের তৈরী গুড় দিয়ে  ভাপা পিঠা খাওয়ার ধুম গ্রাম গুলোতে সবচেয়ে বেশী পরতো।

শীত যতো বাড়তো সেই সাথেই খেজুর রসের মিষ্টতা ও ততোই বারতো। এক সময় খেজুর রসের মন মাতানো মৌ মৌ গন্ধে পল্লী গ্রাম গুলোর অলিগলি ভরে উঠতো। শীতের সকালে খেজুর রসে ভিজিয়ে মুড়ি না খেলে গ্রামের মানুষদের যেন দিনটাই ভালোভাবে শুরু হতো না। এক কথায় শীতের সকাল মানেই অনেক শহর এলাকা সহ বিশেষ করে গ্রামের অলি-গলিতে চলতো রস মড়ির আড্ডা।

সময় যাওয়ার সাথে সাথে রস-মুড়ি খাওয়া সকালের সেই জমজমাট পারিবারিক আড্ডা গুলো ও বর্তমানে আর দেখা মিলেনা। কারন হিসাবে জানাযায়, বাড়ি-ঘড় নির্মাণ আর নির্বিচারে খেজুর গাছ কাটার ফলে ইতি মধ্যেই সারাদেশে অস্বাভাবিক ভাবেই কমে গেছে খেজুর গাছ। এছাড়া ঐতিহ্য ধারনকারী রস-গুড়ের গাছ খেজুর গাছ কাটা হলেও সেই খেজুর গাছ কেই আর রোপন করেনি। তবে এটাও সঠিক যে এক সময় পাখিরা তাদের ঠোট দিয়ে খাবার হিসাবে পাকা খেজুর গাছ থেকে সংগ্রহ করার পর খেয়ে যে আটি ফেলতো সেই আটি থেকেই এমনিতেই গাছের জন্ম সহ বেড়ে উঠতো খেজুর গাছ।

কিন্তু কালের বিবর্তমানে পাখিদের ফেলা আটিতে খেজুর গাছ জন্মালেও অনেক লোকজন সেই গাছটি বেড়ে ওঠার পূর্বেই কেটে নষ্ট ও করে দেন। এছাড়া এক শ্রেণীর অসাধু ইট-ভাটা ব্যবসায়ী জ্বালানী সিহাবে খেজুর গাছ ব্যবহার করার কারনে ও ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুর গাছ। হিসেব করলে দেখাযাবে ইতি মধ্যেই ব্যাপকহারে কমে গেছে খেজুর গাছের সংখ্যা। এছাড়া যে পরিমান খেজুর গাছ আছে তাও সঠিকভাবে পরিচর্যা না করা এবং রসের মৌসুমে গাছ ছিলানো (কাটা) পদ্ধতিগত ভুলের কারণে ও প্রতি বছরই অসংখ্য গাছ মারা যাচ্ছে বলেও গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থানের ন্যায় এবারে ও নওগাঁর পেশাদার গাছির সংকট রয়েছে, তারপরও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বা উপজেলার গ্রাম গুলোতে ইতিমধ্যে শীতের শুরুতে শখের বসে গাছিরা নামমাত্র রস সংগ্রহ শুরু করেছে।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার কর্ণপুর গ্রামের গাছি কুদ্দুস আলী জানান, শীত মৌসুম এলে গাছ ছাটাই করে রস সংগ্রহ করে সেই রস বিক্রির টাকায় এক সময় ভালোভাবে সংসার চালাতে পারতাম জানিয়ে আরো বলেন, আগে প্রতি সেজনে নিজের গাছ ছাড়াও অর্থ বা রস না হয় গুড় দেয়ার চুক্তিতে অন্যের আরো ১০/১৫ টি গাছ ছিলতাম এবং রস সংগ্রহ করে বিক্রি বা গুড় তৈরী করে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি জানিয়ে বলেন, গাছ মরে যাওয়া সহ কেটে ফেলার কারনে এবার মাত্র একটি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছি। ফলে গ্রামবাসী খেজুর রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও জানিয়েনে এ গাছি।

এনায়েতপুর গ্রামের কফিল উদ্দিন নামের এক প্রবীন ব্যাক্তি জানান, এক সময় আমাদের এলাকার গ্রাম গুলোর ঝোপ-জঙ্গল সহ জমির আইল ও পুকুরের পাড়ে প্রচুর পরিমান খেজুর গাছ ছিলো।

বর্তমানে সেই খেজুর গাছ নেই বল্লেই চলে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, হয়তবা এভাবেই এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে খেজুর গাছ এবং হয়তবা সেইদিন আর বেশীদূরে নয় যেদিন খেজুর রসের কথা ও মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাবে।

আগামী প্রজন্মের কাছে খেজুর রস রুপ-কথার গল্পের মত মনে হবে। তবে সচেতনরা মনে করছেন, বাড়ির আনাচে বা রাস্থার পার্শ্বে সহ পরিত্যাক্ত স্থান গুলোতে ফের খেজুর গাছ রোপন করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম  খেজুর গাছের রস বা গুড় সম্পর্কে কোন গল্পকথা বলতে হবেনা।
Hostens.com - A home for your website

সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *