//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js


নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশে তারুণ্যর ভূমিকা

সংস্কৃতি হল মানুষের আচার-আচরণের সমষ্টি।মানুষের জাগতিক নৈপুণ্য ও কর্মকুশলতা, তার বিশ্বাস, আশা-আকাঙ্খা, নৈতিকতা, রাজনীতি, ভাষা, কলা মূল্যবোধ সবকিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। কোন নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের জীবন প্রণালী অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন আচার-আচরণ, কাজকর্ম, পোশাক-পরিচ্ছেদ, প্রচলিত লোককাহিনী, ধর্মীয়-উৎসব-অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান, চিন্তা-চেতনা সবকিছুই সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। তবে নান্দনিক সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটিয়ে সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্যময় গতি সৃষ্টি করে পরিশীলিত এবং পরিশ্রুতি জীবনবোধ। যা কিছু কুৎসিত, যা কিছু অসুন্দর, যা কিছু অনৈতিক, চিন্তা-কর্মে ও আচরণে সে সব থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকাই নান্দনিক সংস্কৃতি মূল কথা। কল্যাণবোধ, দায়িত্ববোধ ও মমত্ববোধের শক্তি হচ্ছে নান্দনিক সংস্কৃতির শক্তি।  নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশে তারুণ্যর ভুমিকা ব্যাপক।
আজকের তরুণরাই দেশের আগামী দিনের অমূল্য সম্পদ। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই হলো তরুণ। অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ কোটি তরুণ-তরুণীর এক বিরাট জনশক্তি বাংলাদেশের রয়েছে। কাজেই তরুণদের  চিন্তাভাবনা, আশা-আকাঙ্খা ও তাদের উদ্যম এবং মেধা নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরিমেয় সৃজনশীল ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী আমাদের তরুণ সমাজ। তরুণ সমাজের মেধা, শক্তি, সাহস ও প্রতিভাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় একটি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি তথা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির চাকা। ফলে তরুণরাই হচ্ছে জাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির ধারক-বাহক। কেননা তরুণরা যে কোন জাতির সর্বাপেক্ষা বলিষ্ঠ, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল এবং উৎপাদনক্ষম শক্তি। তরুণরাই জাতির আশা-আকাঙ্খার সজীব অভিব্যক্তি। তারুণ্যর অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে কোন আন্দোলনই সফল হতে পারে না। তরুণরা জাতির প্রকৃত শক্তি ও সম্পদ। ফলে নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশে তরুণদেরকে দেশপ্রেমের উদ্বুদ্ধ করে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। কোনো দেশে তরুণরা নিজে নিজেই বিকশিত হয় না। তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তার জন্যে প্রয়োজন অনুকূল এক সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশের। যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের বর্তমানে এই বিপথগামিতা, সেই পরিবেশের আমূল সংস্কার অপরিহার্য। তরুন সমাজের অনুকূল সুস্থ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নান্দনিক সংস্কৃতির বিপরীত হল অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি জাতির এক ভয়ানক ব্যাধি। আর অপসংস্কৃতির মূলে রয়েছে দুর্নীতি। যে সমাজে দুর্নীতি আছে সে সমাজে নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো খুবই কঠিন। এই অবস্থায় সকল স্তর থেকে দুর্নীতি অবসান করে, সত্য-সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ নিশ্চিত করতে হবে।
এই লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।
(১) জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করে তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
(২) সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মধ্য দিয়ে প্রথমে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
(৩) সেন্সর বিহীন কোনো বিদেশী সংস্কৃতি আমদানি করা যাবে না।
(৪) বিদেশী রাজনীতির ভালমন্দ যাচাই করে ভালটুকু গ্রহন, খারাপটুকু বর্জন করতে হবে।
(৫) দেশীয় সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্র প্রসারে ও দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিকাশ ও প্রসার করতে হবে।
(৬) সমাজে প্রকৃতভাবে শিক্ষার হার বাড়াতে হবে।
(৭) অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ছবি নাটক বা প্রোগ্রাম টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে প্রকাশ না করা।
(৮) আকাশ সংস্কৃতির সুনিয়ন্ত্রণ করা।
(৯) ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার ত্যাগ করে মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত করা।
(১০) দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির সংঘবদ্ধ প্রয়াস ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে আন্তরিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
(১১) দুর্নীতিমুক্ত প্রকৃত গৌরবগাঁথা আর আত্মত্যাগের ইতিহাস ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে তুলে ধরতে হবে।
(১২) মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, লক্ষ্য চেতনা সমাজ ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
(১৩) রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
(১৪) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
(১৫) সকল ক্ষেত্রে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
(১৬) সকলকে দেশপ্রেম, সততা ও নিষ্ঠার সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে।
(১৭) মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ শিক্ষা সকলের জন্যে নিশ্চিত করতে হবে।
(১৮) সমাজের সর্বস্তরে মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
(১৯) গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সকলকে সক্রিয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
(২০) নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করে, নারী ও পুরুষর সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে।
(২১) ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকার সমূহ নিশ্চিত করতে হবে।
(২২) সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
(২৩) প্রত্যেক নাগরিককে রাষ্ট্রের দেওয়া অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি নিজ নিজ  দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
(২৪) প্রত্যেককে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।
(২৫) দেশ ও জাতির কল্যাণে সকলকে সর্বদা দলমতের উর্ধ্বে থাকতে হবে।
(২৬) দেশের ও জনগণের চাহিদা মোতাবেক সর্বদা গণমুখী ভূমিকা পালন করতে হবে।
নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশে তারুণ্যর ভূমিকা ব্যাপক। এ জন্যে তরুণদের অনুকূল সুস্থ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সকলকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যদি তা অপসংস্কৃতি না হয়। অপসংস্কৃতি জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই অপসংস্কৃতি যাতে সমাজকে কলুষিত করতে না পারে এবং নান্দনিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারে সে জন্যে রাষ্ট্রপরিচালকদের যেমন সচেতন থাকতে হবে তেমনি তরুণ সমাজসহ সর্বশ্রেণীর ও পেশার নাগরিকদেরকে সচেতন হতে হবে। এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তরুণসমাজসহ সকলকে সততা ও দেশপ্রেমের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক পরিচিতি :
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, গবেষক, কলাম লেখক ও সংগঠক)
সভাপতি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js
%d bloggers like this: