নড়াইলের ভাগ্যবিড়ম্বিত ভূমিপুত্র কমল দাশগুপ্তঃ চরম অবহেলিত ও উপেক্ষিত সঙ্গীত প্রতিভা

উজ্জ্বল রায়:
নড়াইলের কালিয়ার বেন্দা গ্রামের ভাগ্যহত সন্তান কমল দাশগুপ্ত। জন্মেছিলেন ১৯১২ সালের ২৮ জুলাই এক সম্পন্ন সংস্কৃতিবান পরিবারে আর মৃত্যুবরণ করলেন অত্যন্ত করুণ, অসহায় অবস্থায় ঢাকায় ২০ জুলাই ১৯৭৪ সালে। সঙ্গীতে হাতেখড়ি বাবা ও জ্যেষ্টভ্রাতার নিকট। উজ্জ্বল রায় নিজস্ব প্রতিবেদক নড়াইল জানান, ভাগ্যবিড়ম্বিত ভূমিপুত্র কমল দাশগুপ্তঃ চরম অবহেলিত ও উপেক্ষিত এক অতি বিরলপ্রজ মহান সঙ্গীত প্রতিভা। যিনি ১৯৪৬ সালে আয়কর দিয়েছিলেন ৩৭ হাজার রুপি, যার বর্তমান বাজার মূল্য এক কোটি রুপী হবে,গাড়ি ছাড়া চলতেন না, শেষ জীবনে গ্রাসাচ্ছাদনের  তাড়নায় ঢাকার হাতিরপুলে মুদিখানার দোকান দিয়েছিলেন, তিনি উপমহাদেশের সেই মহান প্রতিভাশালী সঙ্গীতজ্ঞ, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, কণ্ঠশিল্পী   যশোর(বর্তমান নড়াইল) জেলার কালিয়ার বেন্দা গ্রামের ভাগ্যহত সন্তান কমল দাশগুপ্ত।
জন্মেছিলেন ১৯১২ সালের ২৮ জুলাই এক সম্পন্ন সংস্কৃতিবান পরিবারে আর মৃত্যুবরণ করলেন অত্যন্ত করুণ, অসহায় অবস্থায় ঢাকায় ২০ জুলাই ১৯৭৪ সালে। সঙ্গীতে হাতে খড়ি বাবা ও জ্যেষ্টভ্রাতার নিকট। কলকাতায় শৈশব ও কৈশোর কাটিয়ে বাবার কর্মসূত্রে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বি কম পাশ করেছিলেন। এরপর কলকাতায় মাণিক তলায় বসবাস। নীচে আয়ের প্রধান উৎস  পারিবারিক গুপ্ত প্রেস।
গান শিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, কৃষ্ণচন্দ্র দে( কাণা কেষ্ট), জমিরুদ্দিন খাঁ, দিলীপ কুমার রায়প্রমুখের নিকট থেকে। ২৩ বছর বয়সে গ্রামোফোন কোম্পানীতে সঙ্গীত পরিচালনা ও সুর করার দায়িত্ব পান। সব ভাইবোন নজরুল সঙ্গীতে অবগাহন করেছিলেন। প্রায় সবাই নজরুলসঙ্গীত রেকর্ড করেছেন,  কমল দাশগুপ্ত সহ কয়েক ভাইবোন নজরুল সঙ্গীতে সুরারোপ করেছেন।মাস্টার কমল নামে নজরুলসঙ্গীত রেকর্ড করেন।
কমল দাশগুপ্তর ওপর নজরুলের এতটাই আস্থা ছিল যে তিনি  কমলকে তাঁর পূর্বানুমতি না নিয়ে স্বাধীনভাবে তাঁর গানে সুরারোপের অনুমতি দিয়েছিলেন। কারও কারও মতে কমল দাশগুপ্ত নজরুলের প্রায় ৪০০ গানে সুরারোপ করেন। তার মধ্যে আছে- লায়লী তোমার এসেছে ফিরিয়া, আমি যার নূপুরের ছন্দ, প্রভাত বীণা তব বাজে, তুমি হাতখানি যবে রাখ, আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, আর কতদিন বাকী, এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়, খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী, ওরে নীল যমুনার জল,  এ কোন মধুর শরাব দিলে প্রভৃতি।
বিগত শতাব্দীর ৩-৪ এর দশকে নতুন ধারার বাংলা গান আধুনিক গানের সূচনা। সূচনালগ্নে যাদের সুরের ছোঁয়ায় এসব গানে প্রাণপ্রতিষ্ঠা পায়, তাদের অন্যতম পথিকৃৎ কমল দাশগুপ্ত। সে সময়ে প্রণব রায়ের কথায়, কমল দাশগুপ্তর সুরে আর যুথিকা রায়ের কণ্ঠে কয়েকটি গান দারুণ জনপ্রিয় হয় এবং অদ্যাবধি জনপ্রিয়তা আছে আক্ষরিক অর্থেআধুনিক বাংলা গানের প্রথম যুগের গান যেমন ‘ এমনি বরষা ছিল সেদিন’। প্রায় আট হাজার গানে তিনি সুরারোপ করেছেন। তাঁর  সুরারোপিত অসংখ্য বাংলা গানের মধ্যে আছে- মুক্তির মন্দির সোপানতলে, আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, পৃথিবী আমারে চায়, ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে, তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন, হার মেনেছি গো হার মেনেছি, এনেছি আমার শত জনমের প্রেম ইত্যাদি।
তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভা নানাদিকে বিকশিত হয়েছে। পদাবলী কীর্তন, মীরার ভজন, কবিরের ভজন, হিন্দী- উর্দু- বাংলা ভজন, হিন্দী গীত, হামদ, নাত প্রভৃতিতে সুরারোপ করেছেন। মীরার ভজনে সুরারোপ করে যুথিকা রায়ের কণ্ঠে তিনি গাওয়ান। মহাত্মা গান্ধী এতই সেটি পছন্দ করেছিলেন যে যুথিকা রায়কে তিনি মীরাবাঈ উপাধি দিয়েছিলেন। মীরাবাঈয়ের ভজনের ওপর গবেষণা করায় বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট উপাধি প্রদান করে।  হায়দ্রাবাদের নিজামের গোল্ডেন জুবিলীর বিশেষ সঙ্গীত তিনি সৃষ্টি করেন। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার গানে তিনি সুর দিয়েছেন৷ সঙ্গীতে তাঁর মৌলিক একটি অবদান বাংলা স্বরলিপির শর্টহ্যাণ্ড পদ্ধতির উদ্ভাবন।
বহু বাংলা সিনেমা ও কয়েকটি হিন্দী সিনেমায় তিনি সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন।  কারও কারও মতে তিনি আশিটি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।বাংলা ও হিন্দী চলচ্চিত্রে কয়েকবার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের সম্মান পেয়েছেন। মানুষ হিসেবেও ছিলেন খুবই সংবেদনশীল। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময় নিজের অর্থে লঙ্গরখানা খুলে অনেক দিন চালিয়েছিলেন।খ্যাতি বা যশের জন্য আদৌ লালায়িত ছিলেন না, নীরবে সঙ্গীতসাধনা করে গিয়েছেন৷
তাঁর দুর্ভাগ্য নেমে আসে ভারতে স্বাধীনতার পর। সিনেমা প্রযোজনা করতে গিয়ে সিনেমা ফ্লপ হয়ে দারুণ ক্ষতির স্বীকার হন। নাথ ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বলায় কপর্দকহীন হয়ে পড়েন। হতাশায় নিমজ্জিত হন। ১৯৫৫ সালে বিখ্যাত নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগম কমল দাশগুপ্তর চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় এগিয়ে আসেন ও তাঁকে বিয়ে করেন। কিন্তু আর্থিক দৈন্য ছাড়ে না। ১৯৬৭, মতান্তরে ১৯৬৫ সালে তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। কিন্তু এখানেও তাঁকে গ্রহণ করল না। জীবিকার তাগিদে ঢাকার হাতিরপুলে মুদি খানা খোলেন।  কিন্তু আর্থিক দৈন্য  ঘুচল না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস চালু হলে প্রধান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭৪ সালে এ অমিতপ্রতিভাশালী সঙ্গীতজ্ঞ করুণ, অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ট্রাজেডী আরও গভীর এজন্য  যে বাঙ্গালীরা বেশ কয়েকজন কবি, শিল্পী, সাহিত্যিককে জীবিত অবস্থায় অনাদর, অবহেলা করলেও মৃত্যুর পর সম্মান দিয়ে পাপস্খালনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু মৃত্যুর পরও দুই বাংলায় ভাগ্যবিড়ম্বিত এ মহান সঙ্গীতপ্রতিভা প্রায় অনালোচিত, উপেক্ষিত হয়ে রইলেন, বিস্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছেন।
কমল দাশগুপ্তর সুরে,  প্রণব রায়ের কথায়, নায়ক তথা গায়ক রবীন মজুমদারের কণ্ঠে ১৯৪২ সালের গরমিল’  সিনেমার একটি গান ‘এই কিগো শেষ দান, বিরহ দিয়ে গেলে’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।৭৭ বছর গড়িয়ে গেলেও গানটির আবেদন রয়েছে। পরবর্তীতে বিখ্যাত কয়েকজন কণ্ঠশিল্পী যেমন ফিরোজা বেগম, অনুপ ঘোষাল, কুমার শানু প্রমুখ গানটি গেয়েছেন।
সময়নিউজ২৪.কম / বিএম এম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *