প্রকাশকের মেলা২০২১ : প্রধান সংকট পাঠকের কাছে বই পৌঁছানো :: মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

আমরা সবাই জানি বইয়ের কোনো সীমান্ত নেই। কোনো দেশই তার লেখককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না যে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে তাঁর লেখা যাবে না। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন; এখনকার রাশিয়া; বরিস পাস্তেরনাককে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে বাধা দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এমন ঘটনা আর ঘটেনি। কিন্তু আমরা দেখতে পাই সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে। এশিয়ার মানুষ হয়ে জানতে পারি আফ্রিকার সাহিত্য, তার ভেতরের মানুষের জীবনযাপনের চিত্র। পাশাপাশি সংস্কৃতির রূপরেখাও উদ্ভাসিত হয়। এসব জানা জ্ঞানের সাধনা। জানতে পারি ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকার জীবনযাপনের কথা। এক অর্থে বলা যায়, বই মানবজাতির অক্ষয় সাধনা। জীবনের বাঙ্ময় রূপকে বর্ণবহুল করে তোলে। এভাবে বিশ্বজুড়ে মানুষ একে অপরের দিগ্বলয় দেখে চিহ্নিত করে মানবজাতির জন্য শান্তি-সংস্কৃতির রূপরেখা। জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির প্রকাশক ও ডিইউজে সদস্য, লেখক মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার উক্ত বিষয়গুলো নিয়ে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে এই সংকটের কথাটি বলেন।
বই বিপণনের অভিজ্ঞতা দের  যুগের বেশি হলেও প্রকাশনায় একেবারে নবীন। সর্বপ্রথম একটা বই প্রকাশ করি ২০০৯ সালে। আর প্রকাশক হিসেবে আমি ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রথম অংশগ্রহণ করি। প্রথম প্রকাশিত বইগুলো দেশের সুপ্রিয় সুনামধন্য প্রকাশানা প্রতিষ্ঠান দি ইউনিভার্সেল একাডেমি থেকে। এই বইগুলোর লেখক হচ্ছেন দেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সফল ভিসি প্রফেসর ডক্টর ইমেরিটাস এমাজউদ্দীন আহমদ।  পাঠকের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে আমরা সীমিত অভিজ্ঞতা নিয়ে সব সময় আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছি। বই বিপণন ও প্রকাশনা—দুই ক্ষেত্রেই আমরা ভেবেছি, পাঠক আসলে কী চান? পাঠকের এই চাওয়া এবং প্রকাশক-বিক্রেতার উপস্থাপনার মধ্যে কিছুটা ঘাটতি আছে বলে আমার ধারণা।
বইয়ের জগতে নানামুখী সংকট থাকলেও প্রধান সংকট পাঠকের কাছে বই পৌঁছানো। অর্থ ব্যয় করেও অনেক সময় পাঠক প্রয়োজনীয় বইটি খুঁজে পান না। এ জন্য আমরা প্রথমে পাঠকের কাছে বই পৌঁছানোর কথা ভেবেছি। প্রকাশনা শুরু করেছি অনেক পরে। একটি মননশীল জাতি গঠনের ক্ষেত্রে সৃজনশীল বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বই প্রকাশনা আমাদের দেশে শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রকাশনা ব্যবসা মূলত বইমেলাকেন্দ্রিক। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। শুধু মেলার সময়ই বই প্রকাশ না করে অন্য সময়েও যাতে প্রকাশিত হতে পারে সে জন্য লেখকরাও প্রকাশকদের সহযোগিতা করতে পারেন।
আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পাঠকসংখ্যা কম। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রচুর। অথচ বইয়ের ক্রেতা খুবই কম। ফলে বই প্রকাশনা শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। বই প্রকাশনাকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে পাঠক, লেখক, প্রকাশক, গণমাধ্যম, সর্বোপরি সরকারকেও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বই পড়ার সংস্কৃতিকে যুক্ত করতে হবে। পাঠবিমুখতার ফলে আমাদের সমাজে নানা ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেসব সংকট আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরীক্ষায় পাসনির্ভর পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য খুদে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধন অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য খেলাধুলা করার পর্যাপ্ত সুযোগ যেমন করে দিতে হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পাঠ্য বইয়ের বোঝা কমিয়ে সৃজনশীল বই পাঠে উৎসাহী করে তুলতে হবে।
আমাদের দেশে পাঠাগার প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। যেসব পাঠাগার এখনো টিকে আছে, সেগুলোও প্রতিনিয়ত দুর্বল হয়ে পড়ছে। একটা পাঠাগার একটা এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলে। প্রয়োজনীয় পাঠাগার গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বইয়ের পরিবেশক না থাকায় ছোট প্রকাশকদের টিকে থাকা খুবই চ্যালেঞ্জিং। পেশাদারির অভাবে বেশির ভাগ প্রকাশনা সংস্থাকে বইমেলার পর খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশ্বের সর্বত্র প্রকাশক ও বিক্রেতার সঙ্গে মধ্যস্থতা করেন পরিবেশকরা। বই প্রকাশক ছাড়া আর কোনো উৎপাদকই নিজেদের পণ্য এভাবে বিক্রি করেন না। যে কারণে মৌসুমি ব্যবসার মতো বইমেলা এলে বই প্রকাশের তোড়জোড় শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *