প্রেম মানে না জাতির ভেদাভেদ/ প্রেমের স্বার্থকতা কোথায়

মোসলেম উদ্দিন, হিলি (দিনাজপুর):

খড়ের ছাঁউনি মাটির একটি কুড়ে ঘর। মা আর বড় ভাইকে নিয়ে আরিফের বসবাস। দেড় বছর বয়সে বাবা মারা গেছে। বন্ধু-বান্ধবী আর স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এবং এলাকাবাসীর দোয়ায় চলছে আরিফের লেখাপড়া। ১৯৯৭ সাল এসএসসি পরীক্ষা দেবে সে। প্রথম পরীক্ষা সবাই কত না ভাল খাবার আর রং বেরংয়ের পোশাক পড়ে সবাই পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবে। প্রত্যেকের সাথে কেন্দ্রে যাবে অনেকেই। আর আরিফ সকাল বেলা বাশি পন্তা ভাত খেয়ে মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে চলে গেলো পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা শেষ, আড়াই মাস পর পরীক্ষার ফল প্রকাশ। সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করল আরিফ।

পা রাখল কলেজে। ১৯৯৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় আবারও সে সেকেন্ড ডিভিশনে কৃতক্রার্য হলো। এবার সে পাড়ি জমালো দিনাজপুর সরকারী ডিগ্রী কলেজে। অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র আরিফ। সংসারে লেগে আছে অভাব আর দারিদ্রতা। মায়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে, চলতে ফিরতে পারে না বেশি। মায়ের কষ্ট আর তার মুখে হাসি ফোটার জন্য একটি চাকরীর সন্ধান করেছে আরিফ।

অবশেষে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় একটি সিগারেট কোম্পানির সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত হলো সে। বেতন ২৪০০ টাকা, এটায় যেন আরিফের কাছে অনেক কিছু। ছোট থেকে মা ছাড়া থাকে না কোথাও সে। দেড়শ টাকার একটির ঘর ভাড়া নিলো আরিফ। মার ছাড়া সেখানে থাকা তার কাছে কষ্টকর হয়ে উঠছে।
শেষে কোম্পানির বসকে বলল স্যার আমি তো কখনও মা ছাড়া কোথাও থাকি না। যদি দয়া করে মা আমার কাছে রাখার অনুমতি দিতেন? স্যার মায়ের প্রতি আরিফের ভালবাসা দেখে মুগ্ধ হলেন এবং অনুমতি দিলেন।মাকে নিয়ে আসলেন, মা-ছেলের ছোট সংসারে যেন বিরাজ করছেন স্বর্গীয় সুখ।

বাড়ির পাশে এক বিশাল প্রভাবশালী হিন্দু পরিবার। এলাকাবাসী সহ সবাই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দেখে আরিফকে খুব ভালবাসতে লাগল। স্বক্ষতা গড়ে উঠতে লাগল সেই হিন্দু পরিবারটির সাথে। আরিফকে তারা ¯েœহের চোখে দেখতে শুরু করল। সেই পরিবারে ছিলো এক ছেলে আর এক মেয়ে এবং সেই হিন্দু পরিবারে ঝিয়ের কাজ করতো তাদেরি জাতির ফুটফুটে পূর্ণিমার মত সুন্দর ১২ থেকে ১৩ বছরের একটি মেয়ে। নাম তার শ্রী গোলাপী রায়। ছোট বেলায় গোলাপীর মা মারা গেছে, বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। একটি বড় ভাই সেও বিয়ে করে শ্বশুড় বাড়িতে ঘরজামাই থাকে। বাবা আবার বিয়ে করে বউকে নিয়ে রংপুর শহরে রিক্সা চালায়। প্রথমে গোলাপীকে আরিফ ঐহিন্দু পরিবারে মেয়ে মনে করতেন।

ছোট মেয়েকে দিয়ে সব কাজ করে নিতেন পরিবারের সবাই। দয়ার মন আরিফের সে একদিন বলল কাকিমা আপনার ছোট মেয়েটাকে দিয়ে সব কাজ কেন করে নেন। তখন কাকিমা লজ্জা আর সংকোচ করে বলল আরিফ ও আমার মেয়ে না আমাদের বাসার কাজের মেয়ে। তবে গোলাপীকে আমরা মেয়ের পরিচয় দিয়ে রাখি এবং মেয়ের মত ভালবাসি। সত্যিই তাই দেখে বোঝা যায় না সে ঐপরিবারের কাজের মেয়ে।দিন যত যায় সবার সাথে আরিফের সম্পর্ক গাঢ় হয়। গোলপীর পূর্ণিমার মত মূখ আর মিস্টি হাসি দেখে আরিফ মুগ্ধ হয়ে যায়। তার উপর সে একজন এতিম মেয়ে। আরিফের মা না থাকলে সেই হিন্দু পরিবারটি তার খাবারের ব্যবস্থা করতেন। এক সময় পরিবারের কর্তা আরিফকে ছেলের মত মনে করতে শুরু করলো।

গোলাপী প্রায় সময় আরিফের খাবার এনে দিতো। এভাবে সেই ছোট গোলাপীর সাথে আরিফের মনের মিলন হয়ে গেলো। বছর খানেক পর গোলাপী আর আরিফের সম্পর্কটা হিন্দু পরিবারটিসহ আরিফের মা বুঝতে পারল।

ছেলে বড় হয়ে গেছে বিয়ে দিতে হবে। তাই মা বাড়িতে এস আত্বীয়-স্বজনদের বলে আরিফের বিয়ে ঠিক করলো। আগামী বুধবার বিয়ে। মায়ের কথা আরিফ ফেলতে পারলো না। বিয়েতে মত দিয়ে দিলো। সে জানে গোলাপী হিন্দুর মেয়ে তার সাথে কখনও বিয়ে হবে না। তার উপর সে ছোট একটা মেয়ে। তার কোন ক্ষতি সে করবে না। তবুও আরিফের খুব কষ্ট হচ্ছে গোলাপীর জন্য।

অবশেষে গোলাপীকে আরিফ বলল? গোলাপী সামনে বুধবার আমার বিয়ে। গোলাপী শুনে যেন আকাশ ভেঙে তার মাথায় পড়ল। গোলাপী হাওমাও করে কেঁদে উঠলো। মানে তোমার বিয়ে হয়ে যাবে? আমি আর তোমার সাথে কথা বলতে পারবো না? তোমকে আর দেখতে পাবো না? তার কান্না আর হাজারও প্রশ্ন দেখে আরিফ অবাক।এতোটুকু আবার সে বিধর্মী। আমাকে এতো ভালবাসে? হতবাক হয়ে গেলো আরিফ। সেও তো তাকে অনেক ভালবাসে। এমন সুন্দর একটা মেয়েকে সে যদি বিয়ে করতে পারে তাহলে তার আর কোন চাওয়া পাওয়ার নেই। তাই আরিফ ভাবল আমার আল্লাহর রাসুল যা করেছে আমি তো ওতো কিছু করতে পারবো না। যদি এই বিধর্মীকে বিয়ে করে আমার ধর্মে আনতে পারি তাহলে পরকালে হইতো আল্লাহ আমাকে জান্নাত উপহার দিবে।

গোলপী তুমি আমার সাথে চলে যেতে পারবে? হ্যাঁ যেতে পারব তো। তুমি কি আমার আল্লাহকে আল্লাহ বলে ডাকতে পারবে? গোলাপী হ্যাঁ অবশ্যই তোমার আল্লাহকে আমি আল্লাহ বলে ডাকবো। আরিফ সিদ্ধান্ত নিলো এবং তার বাইসাকেলে আল্লাহকে স্বরণ করে মঙ্গবার খুব সকালে গোলাপীকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিস্যতে পা বাড়ালো। ছোট মেয়ে তার ভালবাসার মানুষের সাথে যাচ্ছে। আনন্দের সীমা নেই গোলাপীর। গোলাপীদের বাসায় ছিলো একটি পশা হিং¯্র কুকুর। তারা তো সবি বোঝতে পারে। গোলাপীর পিছোন পিছোন সেই কুকুরটি যাচ্ছে আর সাইকেলের সামনে বাধা সৃষ্টি করছে।

আরিফ বুঝতে পারলো কুকুরটির মণিবকে নিয়ে আমি চলে যাচ্ছি। তখন আরিফ কুকুরটিকে বিনয়ের সহিত বলল বাবা দেখ তোর মণিবকে নিয়ে আমি একটি ভাল কাজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। যদি আল্লাহর হুকুম থাকে তাহলে বাধা দে। আর যদি হুকুম না থাকে তাহলে আমাদের পথ থেকে সরে যা। নতুবা কালকিয়ামতের দিনে তোকে জবাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে। এমন বলার সংগে সংগে কুকুরটি সরে দাঁড়ালো। সাইকেলের পিছোনে গোলাপীকে বসিয়ে যাত্রা শুরু করলো।

বুকটা আরিফের দুরু দুরু করে কাঁপছে। গোলাপীর কোন ভয় নেই। সামনে একটা নদী পার হতে হবে। ব্রীজ বা নৌকা নেই। সাইকেলটি হাতে নিলো আর গোলাপী তার পিছোনে। আষাঢ় মাস রিমঝিম বৃষ্টি হচ্ছে। পিছোনে চেয়ে দেখে গোলাপী নদীর পানিতে আনন্দে ডুপ পারছে। সে করছি ভয় আর গোলাপী মনের আবেগে করছে গোসল। ধমক দিলো, এই গোলাপী তাড়াতাড়ি আসো। ১৬ কি:মি: পথ সাইকেলে করে নীলফামারী আসলো তারা এক পরিচিতর বাড়ি। সেখানে সাইকেল রেখে বাস যোগে দিনাজপুর এক বন্ধুর বাড়ি এলো।

এদিকে একদিন পর শুরু হলো গোলাপীর মণিব আর তার পরিবারের তান্ডব। আরিফের এলাকায় এসে, তাদের স্বধর্মীদেরসহ থানা পুলিশ নিয়ে শুরু করলো এক বিশাল অভিযান। একে তো হিন্দু, দুইয়ে তো ছোট মেয়ে। তাদের অত্যাচারে মাসহ স্বজনরা বাড়ি ছাড়া। নিজ এলাকায় গ্রামে খালার বাড়িতে গোলাপীকে নিয়ে দ্বিতীয় বারের
মতো উঠলো আরিফ। সবাই দিশেহারা তাদের তান্ডবে। কোথায় পাবে আরিফকে? কখন ফিরিয়ে দিবে গোলাপীকে। প্রতিটি আত্বীয়র বাড়ি বাড়ি খুঁজছেন তারা।
আর তারা দু’জন স্বর্গের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে। গ্রামের এক মওলানা দ্বরা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে পবিত্র কালেমা পাঠ করে গোলাপী মুসলমান হলো এবং আরিফের সাথে শরীয়ত অনুযায়ী বিয়ে হলো।এভাবে কেটে গেলো সাত দিন। পরে তার বড় ভাই চালাকি করে গোলাপীকে নিরাপদে রাখবে বলে নিয়ে এসে তুলে দিলেন তাদের হাতে।

গোলাপী তার আত্বীয়দের দেখে হতবাক হয়ে গেলো। তারা তাকে মাইক্রোবাসে তুলার চেষ্টা করছে। গোলাপী কিছুতেই যাবে না। সে বলছে আমি মুসলমান হয়ে গেছি। আমার বিয়ে হয়ে গেছে।কে শোনে কার কথা। গোলাপী তখন ব্যস্তময় সড়কে লুটিয়ে পড়লো।উঠবে না তাদের গাড়িতে। রাস্তার দুই পাশের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলো। বিভিন্ন গাড়ির যাত্রীরা নেমে এসে দেখে একটি কচি মনের অবলা বাচ্চা মেয়ে কিভাবে ছটফট করছে।তার প্রিয় মানুষটির কাছে থাকার জন্য। তার এই নিষ্পাপ ভালবাসা দেখে অনেক যাত্রীরা সেই হিন্দু সামাজকে বলে উঠলো, যদি সম্ভব হয় মেয়েটিকে রেখে যান। নতুবা বাচ্চা মেয়েটি একটা দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। নি:ষ্ঠুর তারা বলে প্রয়োজনে আমাদের মেয়েকে কেটে নদীর জলে ভাসিয়ে দেবো, তবুও ধর্মচ্যুত করবো না।

নিয়ে গেলো হৃদয় নিংড়ানো সবটুকু ভালবাসা দেওয়ার সেই মানুষটিকে। আরিফ দেবদাস হয়ে গেলে। যেহেতু সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে স্বরণ করে তাকে নিয়ে এসেছিলো এবং পবিত্র কালেমা পাঠ করে তাকে বিয়ে করেছে। তাই আরিফ ভেঙে না পরে নামাজ পড়তে শুরু করলো। আরিফ নামাজ পড়ে আর আল্লাহকে ডাকে। মোনাজাতে সে  আল্লাহকে বলে তোমাকেই তো বলে তাকে নিয়ে এসেছিলাম। তুমিই তো বলেছো তোমার ধর্ম গ্রহন করলে তুমি তাকে নিজ হাতে রক্ষা করবে। তোমার পবিত্র কালাম পাঠ করে তোমার পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলো সে। আজ আবার সেই অপবিত্র ধর্মে তাকে পাঠিয়ে দিলে আল্লাহ।

আরিফের প্রশ্ন, আল্লাহ তুমি কি আছো? তুমি কি সর্ব শক্তিমান? তুমি যদি আমার গোলাপীকে না এনে দেও তাহলে কোন দিন তোমাকে আল্লাহ বলে ডাকবো না? তোমাকে
সর্বশক্তিমান হিসেবে স্বীকার করবো না? মোনাজাতে এভাবে আল্লাহকে ধমক দেবার পর আরিফের মনে কেমন যেন একটা অনুভুতি লাগতে শুরু করলো। সে অবশ্যই আবার আসবে। ২৩ দিন অতিবাহিত হলো, আজ বিকেলে মন বলে উঠলো যে বাড়ি থেকে আমার গোলাপীকে নিয়ে গেছে,ঐবাড়িতে যাই।

গিয়ে একজন বলল আরিফ তোমার গোলাপী ফিরে এসেছে। একবার বিশ্বাস হচ্ছে একবার হচ্ছে না। আবার পাবার আশাও জাগছে। শেষে ঘরে ভিতর গিয়ে দেখি সত্যি তার জীবনের সব চেয়ে বড় পাওয়া মানুষটি ফিরে এসেছে। তাকে ছুঁয়ে দেখলাম সে সত্যিই আমার গোলাপী। আল্লাহর নিকট ক্ষমা চেয়ে শুকরিয়া জানালো আরিফ।

এবার সব বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে শুরু করলো জীবন সংসার।পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ আল্লাহ আরিফকে উপহার পাঠিয়েছেন, তাকে সযত্নে  ধরে রাখতে হবে। সংগ্রামী জীবন শুরু করলো আরিফ। আল্লাহ এমন একটি নিয়ামত তার কুড়ে ঘরে পাঠিয়েছেন, যে কাজে হাত দেই সেই কাজেই তার বরকত। তিন বছর পার হলো, গোলাপীর কোল জুড়ে আসলো অনেক কাঙ্খিত ফুটফুটে কন্যা সন্তান। সংসারে আরও যেন আল্লাহ বরকত ঢেলে দিলো। ছোট একটা ব্যবসা শুরু করলো আরিফ। সেই ব্যবসাথেকেই শুরু হলো আয় অজগার। অল্প দিনে জায়গা জমি কিনে ঘরবাড়ি তৈরি করলো। যেন স্বর্গ নেমে এসেছে আরিফ আর গোলাপীর সংসারে। মেয়ে বয়স পাঁচ বছর, আবারও কোল জুড়ে আসলো গোলাপীর আর একটি কন্যা সন্তান। দুই কন্যা সন্তান আর মাকে নিয়ে উন্নতির দিকে চলতে থাকে তাদের সংসার। স্বর্গ যেন নেমে এসেছে গোলাপীর সংসারে।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, ছোট মেয়ের বয়স তখন সাড়ে তিন বছর। হঠাৎ এক রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গোলাপী আরিফের নিকট বিদায় না নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলো। থমকে গেলো পুরো সংসার। আকাশে উড়ন্ত পাখির থেমে গেলো ডানা,বাতাসের গতি কমে গেলো, সাগরের ঢেউও থেমে গেলো। আরিফ আবারও সেই দেবদাস। কিন্তু না, গোলাপী নেই তো কি হয়েছে। তার রেখে যাওয়া দুটি সম্পদ তো আছে। দুটি সন্তানকে বুকে জোড়িরে আবারও আরিফ শুরু করলো তার সংগ্রামী জীবন।

সময়নিউজ২৪.কম / বি এম এম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *