বঙ্গবন্ধুর জীবনে ইসলামী মূল্যবোধের বিকাশ

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহঃ

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে কিছু বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মুসলিমদের বিশেষ করে ভাগ্যাকাশে নেমে আসে এক দূর্বিসহ পরাধীনতার অপমানিত জীবন। নিজস্ব স্বকীয়তা, তাহযিব-তামাদ্দুন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আক্বীদা বিশ্বাস থেকে মুসলিমরা রাতারাতি এক অনিবার্য পতনুম্মুখ অন্ধকার গহবরে তলিয়ে যেতে থাকে। ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন যখন বেশ দানা বেঁধে উঠেছে, এদেশের বাঙালী মুসলিম সমাজের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত সম্প্রদায় কোন না কোনভাবে সে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। দেশের এই সংক্ষুব্ধ পরিবেশে তখনই জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কৈশোর জীবনে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন করেন স্কুল পরিদর্শনে আসা শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হক কে সম্বর্ধনা দেয়ার মাধ্যমে।

রাজনৈতিক দীক্ষা গ্রহণ করেন মিশন স্কুলে অধ্যয়নকালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিকট থেকে। ১৯৩৯ সালে প্রথম কারাবরণ করেন। ১৯৪০ সালে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৮-এর সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যূত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনসহ অধিকাংশ আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি এ জাতির নেতৃত্ব দেন। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে পুনর্গঠনের জন্য সময় পান মাত্র সাড়ে তিন বছর। তিনি তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশ গঠনে অবদান রাখেন। ব্যক্তি জীবনে পারিবারিকভাবে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে বড় হন এবং ইসলামের মৌলিক বিধানাবলী তিনি মেনে চলতেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তিনি ইসলামের খেদমতে বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এ সকল উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তার ইসলামী চেতনা ও ভাবধারার প্রকাশ পায়।বক্ষমান নিবন্ধে তাঁর জীবনে ইসলামী মুল্যবোধের প্রভাব আলোচিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ঢাকা শহর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ফরিদপূর জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম সায়রা খাতুন। তাঁর পিতা ছিলেন সিভিল কোর্টের একজন সেরেস্তাদার। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন দরবেশ শেখ আউয়াল। তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য বঙ্গীয় এলাকায় আগমন করেন। শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় ১৯২৭ সালে ডিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি ১৪ বছর বয়সে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ১৯৩৪ সালে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে হার্ট দূর্বল হয়ে পড়ে এবং গ্লুকুমা রোগে আক্রান্ত হন। তিন বছর স্কুলে না গিয়ে ১৭ বছর বয়সে ১৯৩৭ সালে পুনরায় স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়ণরত চাচাত বোন শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেনুর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। শেখ মুজিবের অধিকাংশ জীবনীকার তাঁর বিয়ের সময় সম্পর্কে দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তÍ বঙ্গবন্ধু এক সাক্ষাৎকারে আমাকে জানিয়েছেন যে অষ্টম শ্রেণীতে পাঠ্যাবস্থায় তিনি বিয়ে করেন।” মাযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, (বাংলা একাডেমি: মার্চ ১৯৭৪), পৃ. ২৩।

১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ইন্টার মিডিয়েটে কলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৪ সালে ‘ফরিদপুর ডিষ্ট্রিক্ট এ্যাসোসিয়েশন’ এর সেক্রেটারী ছিলেন। এটি ছিলো কলকাতায় ফরিদপুরবাসীদের একটি সংস্থা। প্রেসিডেন্ট ছিলেন কলকাতার চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিষ্ট্রেট নবাবজাদা লতিফুর রহমান।১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ফরিদপুর জেলায় মুসলিম লীগের নির্বাচনী কাজ চালানোর পুরো দায়িত্ব পালন করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁকে এ দায়িত্ব দেন। [মাযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, পৃ. ৫৯] এ বছরেই তিনি ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকে কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে তিনি ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলার খাদ্য-ঘাটতির ফলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে তিনিও প্রতিবাদ আন্দোলনে ‘ভুখা মিছিলে’র নেতৃত্ব দেন। সরকার ক্ষেপে গিয়ে উভয় নেতাকে কারারুদ্ধ করেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থশ্রেণির কর্মচারীদের দাবী-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে তাঁকে বিশ^বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। তমদ্দুন মজলিশ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সূচিত ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে কারারুদ্ধ অবস্থায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবিতে অনশন ধর্মঘট করেন এবং শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ায় ২৭শে ফেব্রুয়ারি মুক্ত হন। এর কিছুদিন পরেই প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে এক সভায় মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সভাপতি এবং তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে তিনি ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে রেসকোর্স ময়দানে সংবর্ধনা দেয়া হয় এবং সেখানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অনবদ্য ভূমিকা পালন করে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল অফিসারের অভ্যুত্থানে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ তিনি নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন। ইন্না লিল্লøাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। [শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী (ঢাকা : দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রথম সং., ২০১৪ খ্রি.]
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শৈশব থেকেই ইসলামী নীতি ও আদর্শের চেতনায় লালিত পলিত হন। যৌবনে মানবিক সেই মূল্যবোধ তিনি ধারণ করেই দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেন। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে তিনি কখনও পিছপা হননি।” [শেখ হাসিনা, শেখ মুজিব আমার পিতা, অগ্রপথিক, মহান স্বাধীনতা ও শোক দিবস সংখ্যা (ঢাকা: ইফাবা-১৯৯৭), পৃ. ৮]

বঙ্গবন্ধুর নামের প্রথম ‘শেখ’ শব্দটি রয়েছে। আরবি ভাষায় বড় আলেমদের ‘শেখ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আজো আরব বিশ্বে বড় আলেমদের ‘শেখ’ বলা হয়। আমাদের দেশে মাওলানা, মুফতি বা আল্লামা হিসেবে অভিহিত করা হয়।তাঁর পূর্বপুরুষ ‘শেখ বোরহান উদ্দিন’ একজন বড় আলেম ছিলেন। তাঁর থেকে এ ‘শেখ’ বংশের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেন, “আমার জন্ম হয় এই টুঙ্গিপাড়া শেখ বংশে। শেখ বোরহান উদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গোড়াপত্তন করেছেন বহুদিন পূর্বে। … শেখ বোরহান উদ্দিন কোথা থেকে কিভাবে এই মধুমতীর তীরে এসে বসবাস করেছিলেন কেউই তা বলতে পারে না। আমাদের বাড়ির দালানগুলির বয়স দুইশত বৎসরেরও বেশি হবে।” [শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৩]

তাঁর জন্মের পর নানা শেখ আবদুল মজিদ কুরআনুল কারীমের সূরা হুদ এর একটি আয়াত থেকে তাঁর নাম বাছাই করেন। আয়াতটির বাংলা অর্থ হলো, “তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং উহাতেই তিনি তোমাদেরকে বসবাস করাইয়াছেন। সুতরাং তোমরা তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর আর তাঁহার দিকেই প্রত্যাবর্তন কর। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক নিকটে, তিনি আহবানে সাড়া দেন”। [সূরা হুদ: ৬১] মুজিবুর রহমান (مجيب الرحمان) অর্থ : রাহমানের (আল্লাহর) ডাকে সাড়াদানকারী। নাম রাখার সময় নানা বললেন : ‘মা সায়রা, তোর ছেলের নাম এমন রাখলাম, যে নাম জগৎ জোড়া খ্যাত হবে।’ [রফিকুজ্জামান হুমায়ুন, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম পৃ. ১৫] এ থেকে অনুধাবন করা যায় বংশানুক্রমিক ধারায় ইসলামী ঐতিহ্য ধারণ করেই তিনি বেড়ে উঠেন।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় পারিবারিক পরিবেশে পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়েরা বেগমের তত্ত্বাবধানে। তাঁর মা ছিলেন খুব ধর্মভীরু। তিনি প্রথম ছেলে সন্তান হওয়ার কারণে মা তাঁকে খুব আদর করতেন। তিনি নিজেও মায়ের খুব ভক্ত ছিলেন। মা তাঁর ছেলে-মেয়েদের জীবনের শুরুতেই ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি আদরের পুত্র খোকার (বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক নাম) জন্য বাড়ীতে তিনজন শিক্ষক রেখেছিলেন। একজন ইসলাম ধর্ম শিক্ষার জন্য মৌলভি সাহেব, দ্বিতীয়জন সাধারণ শিক্ষার জন্য প-িত সাখাওয়াত উল্লাহ পাটোয়ারী, তৃতীয়জন কাজী আবদুল হামিদ। বঙ্গবন্ধু মৌলভি সাহেবের কাছে আমপারা আর প-িত সাখাওয়াত উল্লাাহর কাছে বাংলা বর্ণমালা ও নামতা পড়তেন এবং কাজী আবদুল হামিদের কাছে পড়তেন কবিতা-গল্প ইত্যাদি। [অনুপম হায়াৎ, বঙ্গবন্ধু ও তার শিক্ষকগণ] অর্থাৎ বাল্যকালে ধর্মীয় শিক্ষা তিনি পারিবারিকভাবেই পান।

ধর্মের ঐশি বাণী থেকেই সঠিকভাবে ধর্ম জানা যায়। বঙ্গবন্ধু সরাসরি ঐশি বাণী মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অর্থসহ পাঠ করতেন এবং ধর্মের সঠিক জ্ঞান অর্জন করতেন। তিনি তার আত্মজীবনীতে বলেন, “আমি কোরআন তেলাওয়াত করতাম রোজ। কোরআন শরীফের বাংলা তরজমাও কয়েক খ- ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি।’’[ফিকুজ্জামান হুমায়ুন, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম, পৃ. ১৮০]এর মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক জ্ঞানার্জন করে ধর্মীয় বিধিবিধান পালণে তিনি অনুপ্রণিত হন। নামাজ ইসলামে বাধ্যতামূলক উপাসনা বা ইবাদত। আর তাই তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি বলেন, ‘‘মাওলানা সাহেবের সাথে আমরা তিনজনই নামাজ পড়তাম। মাওলানা সাহেব মাগরিবের নামাজের পরে কোরআন মজিদের অর্থ করে আমাদের বোঝাতেন।

রোজই এটা আমাদের জন্য বাঁধা নিয়ম ছিল।” [শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১৬৯] আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের উপর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ করেছেন। আল-কুরআনের বাণী, “হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের উপর রোজা ফরয করে দেওয়া হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের নবীগণের উম্মতের উপর ফরয করা হয়েছিল। এর ফলে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ পয়দা হবে”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৩] তিনি আল্লাহ তায়ালার ফরয ইবাদাত রোযা নিয়মিত পালন করতেন। তিনি বলেন, “একদিন আমি আওয়ামী লীগ অফিসে ইফতার করছিলাম। ঢাকায় রোজার সময় জেলের বাইরে থাকলে আমি আওয়ামী লীগ অফিসেই কর্মীদের নিয়ে ইফতার করে থাকতাম।” [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২৭৫] ইসলামের মৌলিক পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে ঈমানের পরই সালাত ও সাওমের স্থান। আর তিনি একজন মহান আল্লাহর আনুগত্যপ্রিয় বান্দা হয়ে এ আবশ্যকীয় এবাদত পালণ করতেন। এর মাধ্যমে তাঁর ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রকৃতি ফুটে উঠে।

১৯৩৭ সালে বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি মাস্টার সাহেব গোপালগঞ্জে একটা ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করেন, যার দ্বারা গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। সকল মুসলমান বাড়ি থেকে মুষ্ঠি ভিক্ষার চাল উঠাতেন। প্রতি রবিবার বঙ্গবন্ধু নিজে থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে চাউল উঠাতেন এবং চাউল বিক্রি করে গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার ও অন্যান্য খরচ দিতেন। হঠাৎ মাস্টার সাহেব যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন বঙ্গবন্ধু ‘মুসলিম সেবা সমিতি’র সম্পাদকের দায়িত্ব নিলেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেন, “যদি কোন মুসলমান চাউল না দিত আমার দলবল নিয়ে তার উপর জোর করতাম। দরকার হলে তার বাড়িতে রাতে ইট মারা হত। এজন্য আমার আব্বার কাছে অনেক সময় শাস্তি পেতে হত। আমার আব্বা আমাকে বাধা দিতেন না।’’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৯-১০]কিশোর বয়স থেকে অসহায়কে সাহায্য করার যে গভীর অনুভূতি তৈরী হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর তা আমাদের মহানবীর ‘হিলফুল ফযুল’ গঠনের সাথে তুলনা করা যায়। ‘হিলফুল ফুযুল’ আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ শান্তিসংঘ। রাসূল নবুয়্যাত লাভের পূর্বে তরুণ বয়সে এ শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। কারণ রাসূলও (সা.) তার নবুয়্যাত লাভের পূর্বে মানবতার কল্যাণে কাজ করেছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায়।

বঙ্গবন্ধুর ভেতরে মুসলমানদের বাঁচানোর এক সুতীব্র অনুভূতি দানা বেঁধেছিল রাজনৈতিক জীবন শুরুর প্রারম্ভেই এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তখন তিনি ভেবেছিলেন বাঙ্গালি মুসলমানদের সফলতা। তার আত্মজীবনীতে তিনি বলেন, “তখন রাজনীতি শুরু করেছি ভীষণভাবে। সভা করি, বক্তৃতা করি। খেলার দিকে আর নজর নাই। শুধু মুসলিমলীগ, আর ছাত্রলীগ। পাকিস্তান আনতেই হবে, নতুবা মুসলমানদের বাঁচার উপায় নাই। খবরের কাগজ ‘আজাদ’, যা রেখে তাই সত্য বলে মনে হয়।” [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১৫] তিনি আরো বলেন, “১৯৪২ সালে আমি ফরিদপুর যেয়ে ছাত্রদের দলাদলি শেষ করে ফেলতে সক্ষম হলাম এবং পাকিস্তানের জন্যই যে আামাদের সংগ্রাম করা দরকার এ কথা তারা স্বীকার করলেন। তখন মোহন মিয়া সাহেব ও সালাম খান সাহেব জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন।” [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১৫]
স্কুল জীবনেও বন্ধুর অন্যায়ভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তিনি শৈশবে তার প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর নিজের ভাষায় তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তÍুতি নেন, তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। ওই সময় একজন মুসলমান ছাত্র অন্যায়ভাবে মারপিটের শিকার হয়। বঙ্গবন্ধু তখন স্কুলের শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কাছে বিষয়টির মীমাংসা চান। শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত অন্যান্যের সহায়তা নিয়ে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে মিটমাট করেন। বঙ্গবন্ধু ওই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেন। ওই স্কুলে আর কখনো এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ইসলামে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ঈমানের দাবী। হাদীসে শক্তি থাকলে হাতে, না হয় মৌখিক প্রতিবাদ, অন্যথায় অন্তর দিয়ে ঘৃনা করতে বলা হয়েছে। যেমন-“হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সা. বলেছেন, তোমাদের কেউ কাউকে অন্যায় করতে দেখলে শক্তি ও ক্ষমতা থাকলে হাত দ্বারা বাধা দিবে। যদি তা না থাকে তাহলে মুখদিয়ে বাধা দিবে, যদি তাও না থাকে তবে উক্ত কাজকে মনে মনে ঘৃনা করবে। আর তা হল সর্ব নিম্মস্তরের ঈমান।” [বুখারী]ইসলামের এ মৌলিক শিক্ষা তিনি তাঁর জীবনে বর্মের মত গ্রহণ করেছিলেন। হয়ত শৈশবের ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি থেকেই তাঁর এ মানসিক শক্তি ও মনোবল তৈরী হয়েছিল।

ধর্মে ভিন্ন মতাবলম্বীদের হত্যা করার কোন নিয়ম নেই। খাজা নাজিমুদ্দীনের আমলে আহমদিয়া বা কাদিয়ানি বিরোধী আন্দোলন থেকে পাঞ্জাবে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হাজার হাজার লোক মারা যায়। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গী ও উদারভাবে ধর্মকে ব্যাখ্যা করার দক্ষতা প্রমাণ করে ইসলামের গভীর জ্ঞান তাঁর ছিল এবং ধর্মীয় ব্যাপারে তিনি অনেক উদার ছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘কাদিয়ানিরা মুসলমান না- এটাই হল এই সকল আলেমদের প্রচার। আমার এ সম্বন্ধে বিশেষ কোনো ধারণা নাই। তবে একমত না হওয়ার জন্য যে অন্যকে হত্যা করা হবে, এটা যে ইসলাম পছন্দ করে না এবং একে অন্যায় মনে করা হয়- এটুকু ধারণা আমার আছে। … এমনকি বিধর্মীর উপরও অন্যায়ভাবে অত্যাচার করা ইসলামে কড়াভাবে নিষেধ করা আছে।’’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২৪০-২৪১] তাঁর চেতনায় ইসলামের সঠিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। কারণ ইসলামে অন্যায়ভাবে হত্যাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পরিশেষে বলব, বঙ্গবন্ধু শৈশব থেকেই ধর্মীয় চেতনায় লালিত পালিত হয়েই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অসহায়দের সাহায্য করা ও অধিকার বঞ্চিত বাঙ্গালির জন্য সমূহ ত্যাগ স্বীকার করার দীক্ষা নিয়েছেন। প্রথমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং পরে সেই পাকিস্তানের শোষণের বিরোদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের সময়কালেও তিনি ইসলামী চেতনা ধারণ করতেন। ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় অনুশাসন তিনি মেনে চলতেন। তাঁর সামগ্রিক ব্যক্তিত্ববোধে ইসলামের চেতনার প্রকাশ ঘটে থাকে। আল্লাহ তাঁকে শহীদী মর্যাদা দান করুন। আমীন।

সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *