বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন ১১৩ তম জন্ম জয়ন্তীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

উত্তম বহ্নি সেন
ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সব বিপ্লবীদের অবদান উল্লেখযোগ্য,তাঁদের মধ্যে বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন অন্যতম। পুরোনাম প্রফুল্ল কুমার সেন। জন্ম-ইংরেজি ১৯০৬ খ্রি: ৪ঠা মার্চ, বাংলা ১৩১২ সালের ২০শে ফাল্গুন, রবিবার। জন্মস্থান-বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা/থানার ২নং উজিরপুর ইউনিয়নের ঘাসিগ্রাম সেন বংশে [অবিভক্ত বাংলার ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লা মহকুমার ঘাসিগ্রাম সেনবাড়ি]। গ্রামটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) মিয়াবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁকড়ি নদীর তীরে অবস্থিত। পিতা-নবীন চন্দ্র সেন, মাতা- মুক্তকেশী দেবী। প্রফুল্ল সেনের বয়স যখন মাত্র ৭ বছর তখন মুক্তকেশী দেবী দেহত্যাগ করেন। প্রফুল্ল কুমারের বিমাতা সুরবালা দেবীও দীর্ঘজীবন পাননি। নিঃসন্তান সুরবালা দেবীর বিবাহিত জীবন ছিল সাত বছর। একান্নবর্তী পরিবারে জেঠাইমা বিধবা শশী মুখী দেবী প্রফুল্ল কুমার ও ভগিনি সুহাসিনিকে
অপারহে বড় করে তোলেন।

মিয়াবাজার মাইনর স্কুলে প্রফুল্ল সেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। অল্পবয়সেই তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। মধ্য ইংরেজি স্কুলে ক্লাস সিক্সে বৃত্তি পেয়েছিলেন।হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা প্রভৃতি দেশীয় খেলাধুলাতেও ছিলেন পারদর্শি।বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র প্রফুল্ল সেন কুমিল্লা শহরে শ্রী মহেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য স্থাপিত ঈশ্বর পাঠশালায় সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলে পড়াকালিন সময়েই দেশজুড়ে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ এসে হানা দেয় প্রফুল্ল কুমারের দেহ ও মন জুড়ে। ঈশ্বর পাঠশালার ভালো ছাত্ররা প্রায় সকলেই অনুশীলন সমিতির সভ্য ছিলেন।

তাদের সাহচর্য ও সংসর্গ প্রফুল্ল কুমারকে আকৃষ্ট করে। তদুপরি প্রফুল্ল সেনের পারিবারিক পরিমন্ডলও স্বদেশী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিল, সংস্কৃতি চর্চায় বিকশিত ছিল। প্রফুল্ল কুমারের পিতা নবীন চন্দ্র সেনের সম্পর্কিত কাকা চন্দ্র কুমার সেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেটের হুকুম অমান্য করার অভিযোগে সিভিল জেলে দন্ডপ্রাপ্ত হন।প্রফুল্ল সেনের সম্পর্কিত কাকা শ্রীশ চন্দ্র সেনও কুমিল্লা হাই স্কুলে পড়বার সময় অনুশীলনের কর্মী ছিলেন।

প্রফুল্ল সেন ১৯২১ সালে অনুশীলনের সভ্য হন। স্কুল ছেড়ে স্বদেশী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। প্রফুল্ল কুমার বিপ্লবী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়লে ঈশ্বর পাঠশালা স্কুলের শিক্ষক অনুশীলন সমিতির কর্মী বীরেন সেন প্রফুল্ল কুমারকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বীরেন সেনের খুড়িমা বিরজা সুন্দরী দেবী এবং বীরেন বাবুর স্ত্রী উভয়েই প্রফুল্লকে  করতেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে,বিপ্লবী প্রফুল্ল কুমার সেন বীরেন সেনের খুড়তুতো বোন প্রমীলাকে (বিরজাসুন্দরী দেবীর কন্যা) বাংলার স্বনামধন্য কবি বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিবাহ করেছিলেন।

প্রফুল্ল সেনের পিসতুতো দাদারা (কাশীনগর মজুমদার বাড়ী) বৃটিশ পুলিশের রাজবন্দী ছিলেন এবং অনুশীলন সমিতির ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। পিসতুতো দাদা কালীপ্রসন্ন মজুমদার, বগলা প্রসন্ন মজুমদার প্রমুখ প্রফুল্ল কুমারকে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন গ্রামে স্বদেশী সভায় নিয়ে যেতেন। সম্পর্কিত ভাইপো তারিনী মজুমদার ঢাকা কলতাবাজার সম্মুখ সমরে পুলিশের সঙ্গে খন্ডযুদ্ধে মারা যান। তাঁর সঙ্গী নলিনী বাগচি গুরুতর আহত অবস্থায় ধরা পড়েন। নলিনী বাগচির সেই বিখ্যাত উক্তি চিরস্মরণীয় তারিনী মজুমদারের লুপ্ত প্রায় তৈলচিত্র মহাজাতি সদন এবং অনুশীলন ভবনে প্রফুল্ল কুমারের প্রচেষ্টায় স্থাপিত হয়। এই সময়ে চাঁদপুরের হরদয়াল নাগ, কালীমোহন ঘোষ ঘাসিগ্রামে আসেন এবং গ্রামের গ্রন্থাগারে তাঁদের সম্বর্ধনার আয়োজন করা হয়। অনুশীলন সংগঠনকে জোরদার করতে তাঁদের পরামর্শে প্রফুল্ল কুমার, সুশীল, স্বদেশ প্রমুখ।আশপাশের গ্রামে অনুশীলনের শাখা কেন্দ্র স্থাপন করে।

১৯২৮  প্রফুল্ল কুমার  পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে বাংলায় লেটার নিয়ে চিটাগাং ডিভিশনে প্রথম হন। এই ফলাফল প্রকাশিত হয়, এরপর প্রফুল্ল সেন ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। প্রফুল্ল কুমার চিরদিনই অনুশীলনের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। বিপ্লবী দলে আত্মনিয়োগের বীজ বপন ঘটেছিল প্রফুল্ল কুমারের স্কুল জীবনে। দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচন করতে আত্মবলিদানে প্রস্তুত শত শত তরুণ যুবকের আদর্শ নিষ্ঠা-ত্যাগ ও দৃঢ়তা, সকল বন্ধন-অবসাদ-হীনতা-মিথ্যাকে ভেঙ্গে ফেলতে প্রত্যয়দীপ্ত। এইসব আদর্শবাদী মানুষ যাঁরা এমন আপনভোলা,নিজের হিসাব নিকাশে কোনদিন পারদর্শী ছিলেন না। যাঁরা দেশকে ভালোবাসতে গিয়ে পরিবারের আপনজনকে ভালোবাসতে ভুলেছিলেন, কিন্তু সকল মানুষকেই মুক্ত করতে যাঁরা ধ্যানমগ্ন-মুক্তির আকাঙ্খায় ব্যকুল, যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ
করেছিলেন। তাঁদের খবর কেউ রাখে না। ভাই বন্ধুরাও যেন এঁদের জীবনের গতির সঙ্গেঁ অপরিচিত।

দেশবাসী ও আপনজনেরা দূর থেকে এঁদের শুধু লক্ষ্য করেছেন কিন্তু পরিচয় দিতে সাহসী হননি। সেইসব অবহেলিত তরুণ-যুবকবৃন্দ ঘরে বাইরে শুধু লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন, আর সেই লাঞ্ছনাকেই নিজেদের সাধনার বস্তু করে তুলেছিলেন। বাংলার বিপ্লববাদীদের দেশবাসী সাধারণভাবে সন্ত্রাসবাদী অথবা অরাজকপন্থী আখ্যা দিয়েছিলেন, স্বার্থবাদী-অজ্ঞ-অলস-অন্ধ-গতিহীন মানুষেরা এই বিপ্লবীদের পথচলাকে শুধু ভুল-ভ্রান্তি-উশৃঙ্খলতার সাথে তুলনা করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজ রাজকর্মচারীরাতাঁদের কার্যকলাপের ব্যাপকতা-তাঁদের চিন্তার গভীরতা জানতে পেরে বলেছিলেন-‘এরা কেবল এ্যানার্কিস্ট, টেরোরিস্ট নয়, এঁরা স্বাধীনতা প্রয়াসী’।

আর প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. অমলেন্দু দে আরও সম্মানজনক আখ্যায় এইসব মাতৃমুক্তিকামী পাগল ঘরছাড়াদের অভিহিত করেছেন “জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী” বলে। “তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা:” স্বদেশী যুগের বাঙালী যুবকরা এই ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কিন্তু সেই আগুনের খেলায় জাতি হিসেবে বাঙালী তথা ভারতবাসীর যেন সায় ছিল না। বাংলায় যে বিপ্লববাদ পরিধি লাভ করেছিল তা তথাকথিত ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, সাধারণত: নব্য বাঙালী সমাজের সীমানার গন্ডি অতিক্রম করে বাংলার সাধারণ মন অর্থাৎ আপামর জনসাধারণকে উদ্দীপ্ত করতে সচেষ্ট ছিল। রাষ্ট্রিয় বিপ্লব একটা জাতিতে হঠাৎ সম্ভব হয় না। যদিও জাতীয়জীবনে সেই বিপ্লবের ব্যাপকতা অনস্বীকার্য। বাংলায় বিপ্লব শুরু হওয়ার পূর্বেই বিপ্লবের যোগ্য মন বাংলার শিক্ষিত সমাজে প্রস্তুত হয়েছিল।

ধর্মে,সমাজে, শিক্ষায় সেই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। বাঙালীর মনে সর্বপ্রথম তাই রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের আকাঙ্খাও জেগে উঠেছিল ব্যাপকভাবে।বাংলার শিক্ষিতজনের মন যখন পরাধীনতার দুঃখ লজ্জ্বা থেকে মুক্তির চিন্তায় ব্যাকুল,জাতির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সেই সন্ধিক্ষণে ১৯০২ সালের ২৪ মার্চ দোলপূর্ণিমায় অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়। অনুশীলন কল্পিত সমাজে-প্রত্যেক মানুষ স্বাস্থ্যবান, কর্মঠ ও দীর্ঘায়ু হবে। প্রত্যেক নর নারী হবে বিদ্বান, চরিত্রবান, সাহসী কিন্তু দয়ালু। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষার। সমাজ থেকে ধন বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য,সাম্প্রদায়িক বৈষম্য, প্রাদেশিক বৈষম্য দূর করে সব মানুষের মধ্যে সমতা আনতে হবে। স্বাধীনতা ছাড়া এ অবস্থা সম্ভব নয়, তাই পরাধীনতার বিরুদ্ধে অনুশীলনের বিদ্রোহ ঘোষণা।

প্রফুল্ল সেন অনুশীলনের ভাবধারায় স্কুল জীবনেই উদ্বুদ্ধ হন। পরবর্তী পর্যায়ে দীক্ষা গ্রহণ করে সরাসরি দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি অনুশীলনের সংগঠন বৃদ্ধির কাজে যুক্ত হয়ে কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামের কিছু অংশ, ফরিদপুর, শ্রীহট্ট, যশোর, খুলনা, সাতক্ষিরা, ঢাকা, বরিশাল, ভোলার নানা গ্রামে ঘুরে ঘুরে অনুশীলনের শাখা কেন্দ্র স্থাপনে নিযুক্ত ছিলেন। তাতে ইংরেজ সরকারের বিষ দৃষ্টি তাঁর উপর পড়ে।

পল্লী সংস্কার কাজে গ্রামে গ্রামে ঘুরে খবহঃবৎহ খবপঃঁৎব বা আলোকচিত্রের সাহায্যে কংগ্রেস আন্দোলনের প্রচারের কাজে যে সতেরজন যুবককে নিযুক্ত করা হয়েছিল প্রফুল্ল কুমার সেন ছিলেন তাঁদের একজন। প্রফুল্ল সেনকে এ কাজের উপযুক্ত বিবেচনা করে মনোনীত করেন কুমিল্লার দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতা অতীন্দ্র মোহন রায়।

কুমিল্লা ছিল অনুশীলন সমিতির একটি প্রধান কেন্দ্র। এই জেলায় কিংবদন্তী নেতাদের মধ্যে যোগেশ চ্যাটার্জী, অতীন রায়, প্রভাত চক্রবর্তী, অমুল্য মুখার্জী,যোগেশ চক্রবর্তী প্রমুখ নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা দেশগঠনের কাজে পরিকল্পিত শিল্পগড়ে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের কাজেও গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এর পরে বেঙ্গল প্রভিনশিয়াল কনফারেন্স বসেছিল রাজশাহীতে। প্রফুল্ল সেন কুমিল্লার প্রতিনিধি হিসেবে এই কনফারেন্সে যোগদান করেন। মহারাজ ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী, প্রতুল গাঙ্গুলী, বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী, প্রভাত চক্রবর্তী, যতীন রায় (ফেগুদা), রবি সেন প্রমুখ ব্যক্তি ঐ সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। পুলিশ সম্মেলন স্থল ঘেরাও করে অনুশীলনের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে। যতীন রায়, অমূল্য মুখার্জী, প্রভাত চক্রবর্তী প্রভৃতি নেতাদের সঙ্গে পালিয়ে প্রফুল্ল কুমারও গ্রেফতার এড়ান। তদানীন্তন সরকার তাদেরকে পলাতক আসামী হিসাবে ঘোষণা দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করে পুরষ্কার ঘোষণা করে। এই সময় থেকে প্রফুল্ল সেনের পলাতক জীবন শুরু হয়।

১৯৩২ সালে ছাত্র ও যুবসংগঠনগুলি সরকার কর্তৃক বেআইনী ঘোষিত হয়।আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলা ও টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলা একই মামলার অন্তর্ভুক্ত।প্রকৃতপক্ষে টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলাটি আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলার পরিপূরক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। দুটি মামলাই অনুশীলন সমিতির কর্মকান্ডকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়।
আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলায় সাড়া ভারতব্যাপী জাল বিস্তার করে অসংখ্য গ্রেফতার ও তল্লাসীর পর প্রায় ৫০০ বিপ্লবীকে বিনা বিচারে আটক করে। এর মধ্যেই অনুশীলন সমিতির পলাতক তরুণ বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন বিভিন্ন নামে বিভিন্ন স্থানে দল গঠনের কাজ চালাচ্ছিল।

১৯৩৫ সালের ১৬ই জানুয়ারী প্রফুল্ল সেন ধরা পড়েন পানিহাটি সুখচর খেলার মাঠে। টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে গ্রেফতার
দেখানো হয়। তাঁকে গ্রেফতারের অব্যবহিত পরে তাঁর পরিচয় সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পুলিশ তাঁর উপর প্রচন্ড অত্যাচার চালায়। তিনিও বিনা যুদ্ধে হার মানার পাত্র ছিলেন না। পুলিশ তাঁর পালানোর কারণ জানতে চায় কিন্তু উত্তর না পাওয়ায় অত্যাচারের মাত্রা
বাড়িয়ে দেয়। নির্যাতনের ফলে প্রফুল্ল সেনের মুখের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে ফুলে ঢোল হয়। শুরু হয় জেল জীবন। বিপ্লবীদের জেল জীবন অসহনীয় ছিল। জেলে বন্দীদের সাজার উপর আবার নতুন সাজা চাপানো হত। প্রফুল্ল সেন আলীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৪ নম্বর সেলে, পায়ে ডান্ডাবেরী ও হাতে হাতকড়া। তার উপর তিনি এবং সীতানাথ দে উভয়ে কিছুদিন ছিলেন উলঙ্গ অবস্থায়। এই উলঙ্গ থাকার কারণ বৃটিশ জেল কর্তৃপক্ষের অমানুষিক ও অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে।

আলীপুর কারাগারে কাপড়ের পরিবর্তে লঙ্কা রাখা চটের কাপড় এই বিপ্লবীদের পরতে দিত। এটি জেল কোডের বাইরের শাস্তির একটি নমুনা। লঙ্কা রাখা চটের সেই কাপড় পরলে সারা গা জ্বালা করত। তাই এই দুই বিপ্লবী উলঙ্গ ছিলেন কিছুদিন। এমনি অসহনীয় নানা নির্যাতন চলতে থাকে। আলীপুর জেলে, ঢাকা জেলে, কুমিল্লা জেলে,দমদম জেলে প্রফুল্ল সেনের জেল জীবন স্থানান্তরিত হয়। অবশেষে ১৯৪৬ সালের ৩০ শে আগস্ট রাত ৮ টায় বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন আলীপুর জেল থেকে মুক্তি পান।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে আগষ্টে কলকাতায় হিন্দু মুসলমানের মধ্যে নৃশংস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এতে কয়েক হাজার লোক নিহত হয়। ধীরে ধীরে সেই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ১০ অক্টোবর ১৯৪৬ খ্রিঃ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার রাতে নোয়াখালী জেলায় পল্লীগ্রামে ঘটে এক বীভৎস নারকীয় ঘটনা। এই বর্বরতার শিকার হয়েছিল শ’খানেক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। প্রায় পাঁচ দিন ধরে অব্যাহত ভাবে ঘটতে থাকে নরহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, অপহরণ ও জোর করে ধর্মান্তরকরণ প্রভৃতি।

আক্রমণকারী পক্ষ ছিল মুসলমান আর আক্রান্ত পক্ষ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। দাঙ্গা বিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় প্রফুল্ল সেন কলকাতা থেকে প্রথমে কুমিল্লায় নিজ জন্মস্থান ঘাসিগ্রামে যান। ঘাসিগ্রাম ও আশেপাশের জনগণ স্থানীয় মুসলমান জমিদার কালা মিঞার নেতৃত্বে সংযত ছিলেন। প্রফুল্ল সেন জমিদার কালা মিঞাকে সঙ্গে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাম্প্রাদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে জনতাকে শান্ত রাখার প্রচেষ্টা চালান। এরপর প্রফুল্ল সেন নোয়াখালী যান। সেখানে গান্ধীজীর সাথে ৮ মাস থেকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে শান্তি স্থাপন ও সেবা কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৪৮ সালে প্রফুল্ল কুমার সেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে কর্মজীবন শুরু করেন। অপরদিকে বেলেঘাটায় “দারু শিল্প প্রতিষ্ঠান” নামের একটি কাঠের আসবাবপত্র তৈরীর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। গান্ধীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত প্রফুল্ল কুমারের চরকা ছিল। তিনি নিজে চরকায় খদ্দরের একটি কাপড় বুনেছিলেন। কাপড় খানি মোটা ছিল। কিন্তু নিজ হাতে তৈরী কাপড়খানি তিনি দীর্ঘদিন পরেছিলেন।

কর্মজীবনে প্রবেশের পরও তাঁর সামাজিক কল্যাণমূলক কাজকর্ম চলতে থাকে, পূর্ববাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু পরিবারগুলির পুনর্বাসনের কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। যাদবপুরের পূর্বদিকে জমিদার পালেদের জমিতে গড়ে তোলেন উদ্বাস্তু শিবির। প্রফুল্ল কুমার সেন ছিলেন এই কলোনীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।কলোনীর নামকরণ করেন “বিবেকনগর কলোনি”। কলোনীর অধিবাসী শিশুদের শিক্ষার জন্য স্থাপিত হয় দুটি বিদ্যালয়। একটি “নবকৃষ্ণ পাল আদর্শ শিক্ষায়তন” এবং অন্যটি মেয়েদের জন্য “আদর্শ বালিকা শিক্ষায়তন এই দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন প্রফুল্ল সেন। কলোনিবাসীর সাংস্কৃতিক ও মানসিক উৎকর্ষের জন্য স্থাপিত হয় “বিবেক সংঘ (১৯৫০ খ্রি:)”। এই সংঘেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন- প্রফুল্ল সেন।

বিপ্লবী প্রফুল্ল সেনের জীবনের ৫০টি বছর চলে যায় নানান ঘাত-প্রতিঘাত,আন্দোলন-সংগ্রাম, সেবা ও সত্যব্রত পালনের মধ্য দিয়ে। দেশ-মাটি আর মানুষের তরে নিজের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় থেকে বিলিয়ে দিয়েছেন অর্ধশত বছর।
প্রফুল্ল কুমার সেন ১৯৫৭ সালে ৫১ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ফুলপিয়ারা দেবী আদর্শ বালিকা শিক্ষায়তনের প্রাথমিক বিভাগের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। প্রফুল্ল সেনের ৩ কন্যা (১) ড. পূরবী সেন (২) পুষ্পিতা সেন (৩) পারমিতা সেন। পারমিতা

বর্তমানে প্রয়াত প্রফুল্ল সেন বিভিন্ন সংস্থার আমৃত্যু সদস্য ছিলেন। ১৯৫৬ সালে আলীপুর কোর্টের জুরি মনোনিত হন। অনুশীলন সমিতির বিভিন্ন কমিটির সদস্য ছিলেন।  বিভিন্ন সংস্থা তাঁকে সম্বর্ধনা জানায় ও সম্মানপত্র দিয়ে ভূষিত করেন। ১৯৯৩ সালের ১০ই জুন বিপ্লবী প্রফুল্ল কুমার সেন পরলোক গমন করেন। আমরা এই দেশপ্রেমিকের আত্মার শান্তি কামনা করি। ৪ঠা মার্চ তাঁর ১১৩ তম জন্ম জয়ন্তীতে রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তথ্যসূত্র:
১। বিপ্লবী প্রফুল্ল কুমার সেনের জীবনালেখ্য ও স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু নথিপত্র, গ্রন্থস্বত্ব পূরবী সেন ও বিনোদবিহারী দাস, প্রথম প্রকাশ- ১লা নভেম্বর, ২০০৬, প্রকাশক- তন্দ্রিতা চন্দ্র (ভাদুড়ী), রিডার্স সার্ভিস, ৫৯/৫এ, গড়ফা মেন রোড, কলকতা- ৭০০ ০৭৫।
২। পারিবারিক সাক্ষাৎকার।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও
সংস্কৃতিজন

সময়নিউজ২৪.কম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *