বিশ্বকাপে বাংলাদেশ; দেখুন শুরু থেকে ২০১৯

১৯৯৯

বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে হতাশ করেনি বাংলাদেশ। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল দু হাত ভরে নিয়েই দেশে ফিরে।  বিশ্বকাপে নামার আগের বছরই নিজেদের প্রথম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় জয়টা মেলে এ বিশ্বকাপেই। যদিও প্রথম দুটি ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে খুব একটা পাত্তা পায়নি তারা। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পায় প্রত্যাশিত জয়। আগে ব্যাটিং করে মিনহাজুল আবেদীনের অপরাজিত ৬৮ রানে ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৮৫ রান তোলে বাংলাদেশ। অথচ নান্নু বিশ্বকাপের দলেই ছিলেন না। দেশের ক্রিকেট প্রেমিদের প্রবল প্রতিরোধের মুখেই সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। স্কটিশদের ১৬৩ রানে গুটিয়ে দিয়ে ২২ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পায় বিশ্বকাপের প্রথম জয়।

দ্বিতীয় জয়টি তো অবিশ্বাস্য। গ্রুপ পর্বে তখন চলছিল ফেভারিট পাকিস্তানের দাপট। একের পর এক জয় তুলে নেওয়া শক্তিশালী পাকিস্তানকেই কিনা হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। আগে ব্যাট করে আকরাম খানের ৪২, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুতের ৩৯ ও খালেদ মাহমুদ সুজনের ২৭ রানে ভর করে ৯ উইকেট ২২৩ রান তোলে বাংলাদেশ। স্বল্প পুঁজি নিয়ে টাইগারদের দারুণ সূচনা এনে দেন সুজন। ১০ ওভারে ৩১ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা সুজনের কাঁধে চড়েই ঐতিহাসিক জয়টি পায় বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে বেঁধে ফেলে ১৬১ রানে। ৬২ রানের সেই জয়টি খুলে যায় নতুন দিগন্ত।

২০০৩

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিষেক যেমন দুর্দান্ত তেমনি তার উল্টোটাই হয় ২০০৩ বিশ্বকাপে। বাংলাদেশের জন্য বর্ণহীন একটি বিশ্বকাপ। এ আসরে জয়তো দূরের কথা, উল্টো সহযোগী দুই দেশ কানাডা ও কেনিয়ার বিপক্ষেও হারতে হয়। প্রথম ম্যাচেই দুর্বল কানাডার কাছে ৬০ রানের ব্যবধানে হেরে মনোবল খুইয়ে বসে খালেদ মাসুদ পাইলটের দল। পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ। ১০ উইকেটে হারে তারা। ইনিংসের প্রথম তিন বলে উইকেট নিয়ে অনন্য ইতিহাস গড়েন লঙ্কান পেসার চামিন্দা ভাস। একই ব্যবধানে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছেও হারে টাইগাররা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অবশ্য হারের ব্যবধানটা কিছুটা কমে, ৭ উইকেটের হার। তবে কেনিয়ার সঙ্গে ৩২ রানের হারে ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করে টাইগাররা। শুধু তাই নয়, মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়েও ওঠে নানা প্রশ্ন।

২০০৭

২০০৭ বিশ্বকাপটা নানা কারণেই মনে রাখবে বিশ্ব। প্রথমবারের মতো ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে বিশ্বকাপের অভিযাত্রা, বব উলমারের মৃত্যু, দর্শক বিতর্ক, আইরিশদের উত্থান, গ্রুপ পর্ব থেকে ভারত-পাকিস্তানের বিদায়। এমনকি আম্পায়ারিং কেলেঙ্কারিও কম নয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এ বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের বড় হয়ে ওঠার বিশ্বকাপ।

এক ঝাঁক তরুণ নিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা করে বাংলাদেশ। তবে বিশ্বকাপের আগে দল থেকে বাদ পড়েন আরেক সম্ভাবনাময় তরুণ মানজারুল ইসলাম রানা। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নামার আগে সেই রানার মৃত্যু সংবাদ শুনলো সতীর্থরা। সে শোককে শক্তিতে পরিণত করে কি দুর্দান্তই না খেলল টাইগাররা। অনেকটা ঘোষণা দিয়েই হারিয়ে দল ভারতকে। যার মূলনায়ক ছিলেন বর্তমান অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। যিনি কিনা রানার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

এরপর দুর্বল বারমুডার বিপক্ষে জয় তুলে দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকেট পায় বাংলাদেশ। সেখানেও দারুণ খেলে বাংলাদেশ। অন্যতম শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে আবারো বিস্ময় উপহার দেয় হাবিবুল বাশারের দল। এ বিশ্বকাপেই অন্যরকম ইতিহাস লিখতে পারতো তারা। কিন্তু ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হাতের মুঠোয় থাকা ম্যাচ তিনটে হেরে তা আর করতে পারেনি তারা। বিশ্বকাপের আগমনী সংবাদটা দিয়ে এসেছিল তারা।

২০১১

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। অন্যরকম প্রস্তুতি। কিন্তু তার আগেই বড় দুঃসংবাদ শোনে বাংলাদেশ। ইনজুরির কারণে মাশরাফিকে ছাড়াই স্কোয়াড ঘোষণা করে বিসিবি। বাংলাদেশের জন্য এক মিশ্র অনুভূতির বিশ্বকাপ। উদ্বোধনী ম্যাচে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারতের কাছে ৮৭ রানে হেরে আসর শুরু করে বাংলাদেশ। ভারতীয়দের ছুঁড়ে দেওয়া ৩৭১ রানের লক্ষ্যেও দারুণ লড়াই করেছিল টাইগাররা। এর পর আইরিশদের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ের পর স্বস্তির জয়। তবে পরের ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বিব্রতকর এক হার। মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়ে যায় টাইগাররা। ২২৬ বল হাতে রেখে হেসেখেলে জয় তুলে নেয় ক্যারিবিয়ানরা।

এর পরের ম্যাচে আবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক জয় পায় বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে টাইগার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ২২৫ রানেই গুটিয়ে দেয় ইংলিশদের। জয় তুলে নিতে অবশ্য ঘাম ছুটে যায় টাইগারদের। ১৬৯ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে হারও দেখছিল তারা। তবে নবম উইকেটে অবিশ্বাস্য এক জুটি গড়েন শফিউল ইসলাম ও মাহমুদউল্লাহ। হার না মানা ৫৮ রানের জুটিতে ম্যাচ জিতে নেয় স্বাগতিকরা। তাতে সেমি-ফাইনালের স্বপ্নটা জোরালো হয়। শেষ ম্যাচে চাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়।

কিন্তু উল্টো ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুঃস্বপ্ন টেনে টাইগাররা। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে মাত্র ৭৮ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমান তিনটি ম্যাচ জিতেও ঘরের মাঠে দর্শক হতে হয় বাংলাদেশকে। সেই দুই ম্যাচের খেসারৎ দিয়ে রান রেট বিবেচনায় বিদায় নেয় টাইগাররা।

২০১৫

বাংলাদেশের জন্য স্বপ্নের একটি বিশ্বকাপ। আগের বছরই হারের বৃত্তে থাকা দলটির দায়িত্ব আবারো দেওয়া হয় মাশরাফির হাতে। বিচক্ষণ নেতৃত্বে বদলে দেন পুরো দলকে। আফগানিস্তানকে ১০৫ রানের ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েই শুরু হয় টাইগারদের বিশ্বকাপ মিশন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯২ রানের হারে অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার স্বপ্নটা কঠিন করে ফেলে টাইগাররা। তবে পরের ম্যাচেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে স্বস্তির জয়। স্কটিশদের দেওয়া ৩১৯ রানের চ্যালেঞ্জটা উতরে যায় বিগ ফাইভের চার ব্যাটসম্যানের ফিফটিতে। কিন্তু নকআউট পর্বে খেলতে হলে তখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিততেই হতো বাংলাদেশকে। কারণ শেষ ম্যাচটা যে শক্তিশালী স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।

এডিলেডে সেদিন নতুন ইতিহাসই গড়ে টাইগাররা। বিশ্বকাপে বাংলাদেশী হিসেবে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তার সেঞ্চুরি ও মুশফিকুর রহিমের ৮৯ রানে ভর করে ২৭৫ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। জবাবটা অবশ্য ইংলিশরা ভালোই দিচ্ছিল। ইয়ান বেল, জস বাটলাররা ম্যাচটা কঠিন করে তুলছিলেন। শেষ দিকে ক্রিস ওকসও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। কিন্তু তখনই রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন পেসার রুবেল হোসেন। নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে বিশ্বকাপ দলে থাকাই ছিল যার জন্য বিস্ময়। অবিশ্বাস্য দুটি ডেলভারিতে স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস অ্যান্ডারসনকে বোল্ড করে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন বাংলাদেশকে। ১৫ রানের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেট কাটে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের জয়যাত্রাটা হতে পারতো আরও লম্বা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে স্লো ওভার রেটের কারণে খেলতে পারেননি নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি। তারপরও লড়াইটা ছিল দেখার মতো। মাহমুদউল্লাহর আরও একটি সেঞ্চুরিতে ২৮৯ রানের লড়াকু লক্ষ্যই ছুঁড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিউইরা ম্যাচ জিতে নেয় ৩ উইকেটে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হারের ক্ষতটা দীর্ঘদিন মনে রাখবে বাংলাদেশ। কারণ আম্পায়ারের বিতর্কিত তিনটি সিদ্ধান্তের বলী হয় টাইগাররা। বিশেষ করে ব্যাক্তিগত ৯০ রানে রুবেল হোসেনের বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন রোহিত শর্মা। কিন্তু সে বলটি নো-বল ডাকেন আম্পায়াররা। অথচ রিপ্লেতে দেখা গিয়েছে বলটি কোমরের নিচেই ছিল। এরপর আরও ৪৭ রান করেছিলেন রোহিত। ফলে ৩০২ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোরই পায় ভারত।

জবাবে শুরুতে ধস নামে টাইগারদের ব্যাটিংয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ তখনও স্বপ্ন দেখছিল মাহমুদউল্লাহর ব্যাটে। কারণ দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এ ব্যাটসম্যান আগের দুই ম্যাচেই সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। কিন্তু তিনিও স্বীকার হন আম্পায়ারের। মোহাম্মদ শামির বলটি পুল করেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। লং লেগে সে ক্যাচ ধরেন শেখর ধাওয়ান। রিপ্লেতে দেখা যায় ক্যাচ ধরার সময় বাউন্ডারি লাইনে পা স্পর্শ করে ধাওয়ানের। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সেটাকে ছক্কা না দিয়ে আউট দেন টিভি আম্পায়ার। এরপর আর পেরে ওঠেনি টাইগাররা। বড় হারে শেষ হয় টাইগারদের স্বপ্নযাত্রা।

সময়নিউজ২৪.কম/ এ এস আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *