ভিক্টোরিয়া কলেজ আবাসিক হলে যত সমস্যা-সংকট-অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ। শতবর্ষী এ প্রতিষ্ঠানে ২৭ হাজারেরও বেশী ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত। তবে আবাসিক সুবিদা ভোগ করেন মাত্র ১২শ শিক্ষার্থী। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য রয়েছে কবি নজরুল ইসলাম হল, ছাত্রীদের জন্য রয়েছে নওয়াব ফয়জুন্নেছা হল। দু’টি হলে ৪শ করে মোট ৮শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত অবস্থান করে। নজরুল হল চালু করা হয় ১৯৬০ সালে, এবং ফয়জুন্নেসা হল চালু রাখা হয় ১৯৯০ সালে।

উভয় হলে রয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সহ নানা বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে নানা সংকট-সমস্যা। বিনা রসিদে টাকা আদায়, একই বাবদে একাধিক বার ফি আদায়, অপরিচন্ন পরিবেশ, মশার উৎপাত, টয়লেট সমস্যা, বহিরাগতের হলে অধিপাত্য, হলে চুরি, খাবার ও খাবারের পরিবেশে নিন্ম মানসহ নানা বিষয়ে অভিযোগ করেছে আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এসব বিষয়ে কতৃপক্ষের নিকট জানালে হল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয় ছাত্রীদের। এছাড়াও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, মিছিল, মিটিং এ যেতেও বাধ্য করা হয় তাদের। যে কোন মিটিং মিছিল না গেলে নজরুল হলে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগ।

নজরুল হলের বয়স ৬০ আর ফয়জুন্নেসা হলের বয়স ২৯ বছর। ইতোপূর্বে শিক্ষার্থীদের থেকে বিদ্যুত বিল নেওয়া হতো না। চলতি বছরে শিক্ষার্থীদের বিদ্যুত বিল দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিদায়ী অধ্যক্ষ রতন কুমার সাহার সময়ে আন্দোলন ও অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতারা। তবে কোন সুফল পায়নি শিক্ষার্থীরা। অথচ ভর্তি রসিদে দেখা যায়, সিট ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল খাতে নজরুল হল ছাত্রদের থেকে প্রথমেই ফি নেওয়া হয়েছে। উভয় হলের বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি ও রসিদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অর্থ বিষয়ে নানা অস্বচ্ছতা রয়েছে। উভয় হলের রসিদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। নজরুল হলের মাসিক চার্জের ফি বিবরণ বিস্তারিত লেখা নেই, আর ফয়জুন্নেসা হলে মাসিক চার্জসহ বিভিন্ন ফির রসিদ-ই দেওয়া হয় না। রসিদে ম্যাগাজিন, মিলনায়তন, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা সফরসহ কয়েটি খাতে ফি আদায় করা হয় ভর্তির সময়। তবে বিষয়ে তেমন কোন কার্যক্রম নেই বলে জানান ছাত্র-ছাত্রীরা।

ফাতেমা আক্তার তন্বী নামে একজন কলেজ ছাত্রী বলেন, হলের পরিবেশ আর নানা অভিয়মের কারণে হলে থাকতে মন চায় না। দ্বিগুণ টাকা দিয়ে ম্যাচে থাকি।


ফয়জুন্নেছা হলের বিদায়ী ছাত্রী নাজনীন জাহান মুন্নি জানান, পত্রিকায় মেয়েদের হলের অর্থকেলেঙ্কারি নিয়ে সংবাদ হয়েছে। এজন্য তোফায়েল স্যার হল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। নিলুফার ম্যাডাম ও বলেছেন, হলের কোন বিষয় যদি বাহিরে যায়, তাহলে ছাত্রীদের খবর আছে। কোন বিষয়ে সমস্যার কথা জানালেই তাদের কথা হলো, ভালো লাগলে থাকো। নয়তো বের হয়ে যাও।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে হলের বর্তমান তিনজন ছাত্রী অভিযোগ করেন, নারী দিবসে সরকারি দলের অনুষ্ঠানে যেতে বাধ্য করেছে ছাত্রলীগ সদস্য জান্নাত। এছাড়াও কারণে-অকারণে রাজনৈতিক হুমকি প্রদান করে সে। হলে ভর্তির রসিদ ও নোটিশ দেখিয়ে একাধিক ছাত্রী জানান, বিভিন্ন বর্ষের ভর্তি ফির টাকার অংশ ভিন্ন। যেমন দ্বিতীয় বর্ষের বিজ্ঞপ্তিতে ১০ হাজার ৫শ টাকা রয়েছে। সেখানে ১০ হাজার ৫শ টাকা নিয়ে রসিদে ৮ হাজার ১৬০ টাকা লিখা হয়। ডাইনিং জামানত ফি বাবাদ ১৮শ টাকা নিলেও রসিদে ১৫শ টাকা লিখা হয়ে থাকে। ছাত্রীরা আরো জানান, কয়েক দিন পরপর ফ্রিজ মেরামতের অজুহাতে বিনা রসিকে চাঁদা আদায় করা হয়, মাসিক চার্জের ও কোন রসিদ প্রধান করা হয় না।

উভয় হলের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ভর্তির টাকার সাথে পরিচয়  পত্রের টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু পরিচয় পত্র বিতরণের সময় তাদের থেকে পুনরায় টাকা দিতে হয়। নজরুল হলের ছাত্ররা অভিযোগ করেন হলে বহিরাগত ও স্থানীয়দের প্রভান রয়েছে। একাধিক কক্ষ বহিরাগতদের দখলে রয়েছে। এবং হলের দায়িত্ব প্রাপ্ত শিক্ষকরা হলে রাত্রী যাপন করেন না। ফলে তারা এ সমস্যা সমূহ জানেন না। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন যে সকল শিক্ষকরা হলে অবস্থান করেন, তাদের মধ্য থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হউক।

নজরুল হলের আবাসিক ছাত্র ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের মার্ষ্টাসের শিক্ষার্থী আ. সাত্তার ও এমরান হোসেন জানান, ভর্তির সময় বিদ্যুৎ বিল নেওয়া হয়। মাসিক  ভাবে আবার ফি নেওয়ার অযৌক্তিক।


ছাত্রলীগ নেতা রুবেল আহম্মেদ সুকরিয়া জানান, হলের নিরাপত্তা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। সর্বাক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও এর ভিডিও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। হলে ইতোমধ্যে কয়েকটা চুরির ঘটনা হয়েছে।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা হল প্রভোষ্ট নিলুফার সুলতানা বলেন, পরিচয় পত্রের  জন্য পরে যে টাকা নেওয়া হয়, তা পরিচয় পত্রটা গলায় ঝুলানোন জন্য একটা ফিতা দেওয়া হয়। সেটার জন্য অল্প কিছু টাকা নেওয়া হয়। অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে  প্রভোষ্ট বলেন, ছেলেদের হলে এক রসিদে টাকা নেওয়া হলেও মেয়েদের হলে তিনটি রসিদে টাকা নেওয়া হয়। মাসিক চার্জসহ কিছু টাকার রসিদ কলেজ থেকেই আমাদের কাছে দেয়নি। এ সকল টাকার হিসাব বালাম খাতায় লিখে রাখা হয়।

ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি প্রসঙ্গে নওয়াব ফয়জুন্নেছা সহ-প্রভোষ্ট তোফায়েল আহমেদ বলেন, আসলে বিষয়টি সঠিক নয়। ছাত্রীরা গ্রাম থেকে আসে অনেক সময় নানা কিছু বুঝে না। না বুঝে তর্ক করে। একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কখনো নরম হতে হয়, কখনো গরম হতে হয়। তারা তো আমাদের সন্তানের মতো।


কবি নজরুল ইসলাম প্রভোষ্ট মো. মশিউর রহমান জানান, বহিরাগত কোন ছেলে হলে অবস্থান করে এ বিষয়ে কোন তথ্য আমার কাছে নেই। বিদ্যুত বিলের বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিল থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কোন বাবদ কত টাকা নেওয়া হয় তা রসিদে নেই ঠিক। কারণ এ রসিদগুলো অনেক আগের তৈরি।

সার্বিক বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রুহুল আমিন ভূইয়া বলেন, সংকট সমস্যার কথা স্বীকর করেন তিনি বলেন ছাত্রীদের জন্য নবর্নিমিত হলের কাজ প্রায় শেষ। ছাত্রদের জন্য হাজার আসন বিশিষ্ট একটি নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। যদি তা সফল ভাবে শেষ করতে পারি তবে ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট কিছুটা কমবে। বিনা রসিদে টাকা আদায়, অর্থনৈতিক নানা অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। মাসিক বৈষকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজনে হলের বিষয়ে একটি বিশেষ সভা করা হবে। আমি যোগদান করেছি চার মাস হয়ে, ফলে সব বিষয় আমার জানাও নেই।

সময় নিউজ২৪.কম/এএসআর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *