মাসের শেষে দেশে টাকা পাঠাতে হয়, যতক্ষন বেঁচে থাকবো এই দায়িত্ব থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই

প্রবাসী জীবনের সুখ দুঃখের কথা লিখতে গেলেই মনটা কষ্টে ভরে উঠে, কলম যেন থেমে যেতে চায়।বুকের মধ্যখানে অজানা এক শুন্যতা আসন করে বসে, পুরনো স্মৃতির খাতার প্রতিটি পাতা নতুন করে চোখের সামনে ভেসে উঠে নিজের অজান্তে চোখ থেকে অনাখাংখিত কিছু জল ঝরে পড়ে।
নিজেকে বড় একা মনে হয়, পাওয়া আর না পাওয়ার হিসেব মিলাতে পারি না।অবহেলা আর অনাদরের এই প্রবাসী জ়ীবনের ইতিবৃত্ত জানি না কোথা থেকে শুরু করবো। চেষ্টা করবো আমাদের যন্ত্রনা গুলো সবার সাথে ভাগাভাগী করে নিতে, জানি সম্ভব নয় তবুও চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি। স্ব্প্নে্র প্রবাস বাস্তবে বিশাল আকারের এক দানব বললে ভূ্ল বলা হবে না। প্রবাস নামক দানবের কাহিনী লিখতে বসেছি তাই কিছু ভয় কিছু কস্ট আমাকে পিছনে আকড়ে ধরেছে।
আজ আমি সব কিছু উপেক্ষা করে পাঠকের সামনে প্রবাস জীবনের যন্ত্রনা তুলে ধরার আপ্রান চেষ্টা করবো, যা অনেকের কাছে নতুন এবং অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে। আমি যা লিখবো তার এক একটি অক্ষর বাস্তব সত্য। যাহা বাস্তব, তাহা সহজে শ্রুতি মধুর হয় না, সুখের শেষ সীমায় নিয়ে যায় না। স্বপ্নের সাজানো প্রবাস আর বাস্তবের এই প্রবাসের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যাবধান।বিষেশ করে আমার এই লেখার সাথে স্বপ্নের প্রবাসের কোন যোগসূ্ত্র নেই।
আমরা যারা প্রবাসী তাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে অনাখাংখীত হাজারো কাহিনী যা আমাদের আপনজন দেশবাসী জানেন না, আজ আমি প্রবাসের বাস্তব রূপ দেখাবো। আজ আমি প্রবাসীর ক্রন্দন শুনাবো।
অনেকদিন থেকে এই ধরনের একটি লিখবো লিখবো করে লিখা হয়ে উঠেনি। কষ্টের কথা গুলো নিয়ে লিখতে গেলে কষ্ট বাড়ে বই কমে না, আমাদের যন্ত্রনা হাহাকার শুনিয়ে আমাদের ভালোবাসা প্রান মানুষের চোখে জল ঝরিয়ে কি লাভ? যাদেরকে আমরা প্রবাসীরা এতো ভালোবাসি ওদেরকে বেদনার সাগরে ভাসানো কি ঠিক হবে?
হয়তো অতিরিক্ত কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্তি দেয়ার জন্য এই নিরবতা পালন করছি। কিন্তু এখন সময় এসে গেছে তাই বুকে পাথর রেখে হলেও আমাকে লিখতে হবে। আমাদের অজানা কষ্ট পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জানা উচিৎ।আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমার যন্ত্রনা আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখবো কাউকে কোনদিন কিচ্ছু বলবো না, আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত কথা রাখতে পারলাম না।আমি আমার বিবেকের কাছে হার মেনেছি, আমার বিবেক আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় বিবেকের এই দংশন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় অবলম্বন করতে হলো।
আজ আমি অনাখাংখীত বিষয় নিয়ে লিখবো, আমি যা জেনেছি আমি তা সবাইকে জানাবো,
আমি যা দেখেছি তাই লিখবো, আমি যা শুনেছি তা লিখবো না। আমার এই লিখার সত্যতা যাচাই করবে লক্ষ লক্ষ প্রবাসী ভাই বোন।
এই লিখা কোন রোমান্টিক উপন্যাস নয়, কারো একজনের জীবন কাহিনী নয়।এই লেখাগুলো আমার মতো লক্ষ লক্ষ প্রবাসী ভাই বোনের প্রতিদিনের কাহিনী, চোখের জল দিয়ে লেখা এই কাহিনী।
আমি জানি এবং বিশ্বাস করি আমার এই লেখা ভালোবাসা প্রান আপন মানুষকে অন্তরে অন্তরে কাদাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
পৃথিবীর ওজন থেকে আরো বেশী ওজনের কষ্ট বুকে নিয়ে আমরা যে বেঁচে আছি তা আজ আমাকে লিখতে হবে। সবাইকে পরিচয় করে দেয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।
ভাগ্য পরিবর্তে্র দৌড় ঝাঁপ দিতে গিয়া প্রবাসীরা কতবার মৃত্যুবরন করে আর কতবার বেঁচে উঠে তার হিসাব কে রাখে?
ভালোবাসার কাংগাল, একটু আদরের কাংগাল চোখের জল চোখেই শুকায়, যাদের বুকের আশা বুকেই শুকিয়ে কাঠ হয় যা স্বচোক্ষে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে কারন আমি ছিলাম তাদের একজন।
এসব রূপকথার পল্প নয়, সাজানো কোন কাহিনী নয় যা আমি আমার ইচ্ছেমত কাগজের বুকে আঁচড় কেটে কল্পনার রঙ দিয়ে সাজিয়েছি।
এক সময় প্রবাস সম্পর্কে আমারও অন্য রকম ধারনা ছিল যা আজ আর নেই। বাস্তবতার সাথে পরিচিত হবার পর আমার ক্কপল্পনায় সাজানো প্রবাসের প্রানকাড়া ছবিটি তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে গেল। দেখতে দেখতে সারাজীবনের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্ব্প্ন মরুভূমির আকার ধারন করতে এতটুকু সময় লাগে নি। কল্পনায় যে কোন কিছুতে রঙ দেয়া যত সহজ বাস্তবে তা কিন্তু অনেক সময় হয়ে উঠে না।
আমরা যাহা ধরতে পারি না, যাহা নাগালের বাহিরে থাকে না এই ধরনের বিষয়বস্তুকে খুবই প্রাধান্য দিয়ে থাকি এবং ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। মনে মনে সফলতার একটা চিত্র দাঁড় করে নিজে নিজেই তৃপ্ত হই, যেমন প্রবাস জীবন।
যারা প্রবাসের সাথে এখনও পরিচিত হবার মত সুযোগ হয় নি বা তেমন সম্ভাবনা নেই তাদের বেলায় এই ধরনের সুখস্ব্প্ন দেখা খুবই সাভাবিক।
স্ব্প্ন দেখা অন্যা্য নয়, প্রতিটি মানুষের জীবনে সুন্দর কিছু স্ব্প্ন থাকে এবং এই স্ব্প্নকে বাস্তব রূপ দেয়ার সহজ উপায় হল প্রবাস গমন। জীবনকে নানা রঙ্গে সাজাতে হলে স্ব্প্ন দেখা খুবই জরুরী, স্বপ্ন ছাড়া এই জীবন তো আর সাজানো যায় না, তাই স্ব্প্নকে সম্বল করেই আমাদেরকে এগুতে হয়।
স্বপ্নকে যত সুন্দর করে সহজে সাজানো যায় বাস্তবকে এত সহজে হাতে নাতে ধরে কাছে বসানো যায় না। স্বপ্নের সাথে বাস্তবের এই বিবাদ আজীবন থেকেই চলে আসছে যা অশ্বিকার করার কোন উপায় নেই। আকাশের তারা দেখে আমরা কত ধরনের আশা পোষন করে থাকি। “আহারে যদি ঐ তারার দেশে যেতে পারতাম” সত্য কিন্তু অন্য কথা বলে। তারার বুকে বাস করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় কারন তারাকে মানুষের বাসযোগ্য করে সৃষ্টি করা হয় নি।এত কিছু জানার পরও তারার দেশে যাবার আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়। তার একটি মাত্র কারন আর তা হলোঃ যাহা লাগালের বাহিরে তাহা নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার একান্ত চেষ্টা আর এরই নাম হল স্বপ্ন।
আমরা যারা প্রবাসী সবার মনে এই তারার দেশের সুন্দর একটা স্বপ্ন ছিল ভাগ্যক্রমে এই তারার দেশের স্বপ্ন সত্য হলো। তবে যেভাবে স্বপ্নকে সাজিয়ে অপেক্ষমান ছিলাম ঠিক সেভাবে স্বপ্ন ধরা দেয় নি। অনেকটা সবুজ রঙের বিষের মতো। বিষের রঙ দেখতে খুবই সুন্দর তবে পান করে প্রান বাঁচনো যায় না, হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলে হাত পোড়ে যায়। স্বপ্ন সব সময় বাস্তব থেকে একটু দূরে থেকেই যায়।
মানুষ যখন কাংখীত জীবনের স্বপ্ন দেখে তখন বেহিসেবী স্বপ্ন সাজাতে এতোটকু কার্পন্য করে না।স্বপ্নের পর স্বপ্ন সাজিয়েছি, বাড়ী হবে গাড়ী হবে জায়গা জমি কাঁচা টাকা সহ পরিপুর্ন সুখী হবার জন্য যতকিছু প্রয়োজন সব। ভূ্ল করেও মা মাটির বিরহের কথা মনে আসে নি। জীবনে যাহা বাস্তব হয় নি অনুমান করে তা বুঝে নেয়া সহজ বিষয় ছিল না। আমরা শুধু সুখটাকে হিসেব করেছি দুঃখটাকে হিসেব করি নি কারন অজানা ভূবনের সাথে আমাদের কোন পরিচয় ছিল না।
প্রবাসের মাটিতে পা দিতেই শুরু হয়ে যায় মা মাটির বিরহ, স্বজনের বিরহ যা স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি। মনে হতো প্রবাসে যাবো আর দুহাত ভরে টাকা রোজগার করবো, অবস্থার পরিবর্তন হবে জীবনে আর কোন স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা অপুরন থাকবে না। মাত্র কিছু দিনের ব্যা্বধানে চোখের জল শুন্য হতে শুরু করলো অন্তরের চারপাশে নতুন যন্ত্রনার জন্ম হলো। শত সুখ শত স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখেও আমাদের অশান্ত মন শান্ত হয় না। ফেলে আসা কুঁড়ে ঘরের কথা বার বার মনে পড়ে। মায়ের হাসি কান্না সন্তানের বাবা ডাক শুনার জন্য প্রান হু হু করে বেলায় অবেলায় কেঁদে কেঁদে মরে। এই বিরহের কান্না থেকে আমাদের এক মূহুর্তের জন্য মুক্তি নেই। প্রবাসীর বুকে এই কষ্ট সব চেয়ে বেশী জায়গা দখল করে বসে আছে।অথচ আমাদের বুকের এই যন্ত্রনাকে দেশের মানুষ বড় করে দেখে না এমনকি কেউ জানতেও চায় না।
বাস্তব সব সময় একটু তেতো হয়ে থাকে,তবুও আমাদের এই ভাগ্য অন্নেষনের দৌড় ঝাঁপ চলতেই আছে এবং চলবে।
‘দীর্ঘ ১৩ বছর শেষ হয়ে গেলো  প্রবাসে
দীর্ঘ ১৩ বছর শেষ হয়ে গেলো কখন যে ১৩ বছর  প্রবাসে কাটিয়ে দিলাম সংসারের ঘানি টানতে টানতে। টেরই  পেলাম  না, এক কথায় সংসারের সুখের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলাম নির্লজ্জ, অসহায় হয়ে প্রবাসের মাটিতে। সংসারের সুখের পিছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে জীবনের  বসন্ত  শেষ হলো বুঝতে পারিনি ।
 মাঝেমধ্যে অভিমানে
    মনে মনে বলি  দেশ ছেড়ে কেন?
  একা একা জ্বলছি দূর প্রবাসে।
  আমি তো চেয়েছিলাম সবাইকে নিয়ে সুখে থাকতে।
কী পেলাম আপনজনদের থেকে যন্ত্রণা ছাড়া?
 কাদের জন্য জীবনের
১৩ বছর যন্ত্রণার প্রবাসে ঘাম ঝরিয়েছি এবং  ঝড়াচ্ছি
আরও কত বছর ঝরাতে হবে ঘাম
ও নীরবে চোখের পানি
আমি তা,নাহি জানি জানে
একমাত্র  আমার আল্লাহ ।
কাদের সুখের জন্য তবে কবর দিয়েছি  প্রবাসে  আমার যৌবন!
প্রবাসীদের সম্পর্কে দেশের মানুষের ধারনা অন্য রকম, অনেকটা রূপকথার কাহিনীর মত। কোন এক সময় আমিও ঐ রূপকথায় বিশ্বাসী ছিলাম তাই সহজেই অনুমান করতে পারি।
প্রবাসী বলতে একটা সুখী মানুষকে ইঙ্গিত করা হয়। যাদের নেই কোন অভাব।
পকেট ভর্তি টাকা আর না চাইতে হাজার সুখের ফুলঝুরি আমাদের চারপাশে চরকার মত ঘোরতে থাকে। চাহিবা মাত্র সবকিছু আমাদের সামনে এসে হাজির।
এই কথা গুলো যখন সবাই বলাবলি করে আমি একা একাই হাসতে বাধ্য হই। না হেসে কি উপায় আছে? প্রবাসের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করার পর এই কথা যখন কানে আসে তখন নিজেকে নিয়েই হাসি। সত্য কথা গুলো বলতে ইচ্ছে হয় কিন্তু বলা হয় না কারন আমার এই বস্তা পঁচা কথা কেউ শুনবে না তা আমি ভালো করেই জানি। ভূ্ল করে যদি কারো কাছে প্রকাশ করা হয় তখন আমাদেরকে নিয়ে অন্য কথা বলা হয়, রহস্যময় চোখ দিয়ে আমাদেরকে বার বার পরখ করা হয়।
দেশের মানুষের বিশ্বাস আমরা মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছি, ফাঁকি দেবার জন্য কাহিনী রচনা আর কি। দেশের মানুষের ধারনার সাথে আমাদের কোন মিল নেই যা আমার মতো প্রবাসীরা এক বাক্যে স্বীকার করবেন। দেশের অধিকাংশ মানুষ আমাদেরকে স্বার্থ্পর হিসাবেই জানে। আমরা নাকি আমাদেরকে নিয়েই ব্যাস্ত। আমরা যদি সত্যি সত্যি স্বার্থ্পর হই তাহলে কেন বার বার দেশের মাটিতে ফিরে যাই? কেন আমাদের চোখের জল শুকায় না?
কেন সবকিছু ভূ্লে প্রবাসে পড়ে থাকি? আমাদেরকে বলা হয় স্বার্থ্পর! হায়রে মানুষ একি হলো তোমাদের? কেন এত বড় অপবাদ দাও? লক্ষ লক্ষ প্রবাসীরা যদি স্বার্থ্পর হতো তাহলে এই বাংলার অন্য এক রূপধারন করতো।
বিশ্বে্র বুকে মাথা উঁচু করে দাড়াবার মতো সুযোগ হতো না। আমাদের বদান্যতায় আমাদের সাহায্য সহযোগীতায় এই সোনার বাংলা স্বদর্পে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যার প্রমান বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যমান। আমাদের কষ্টার্জিত এক একটি পয়সা দেশের মানুষের সুখের পিছনে ব্যা্য হচ্ছে তা কি কেউ অশ্বিকার করতে পারবে?
এই বাস্তব সত্য বেশীর ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে না। না জেনে না বুঝে আমাদেরকে দোষ দেয়া হয়, আমাদেরকে ভূ্ল বুঝে অপবাদ দেয়া হয়, আঘাত করা হয়। যাদের মঙ্গল কামনায় আমাদের আমাদের শরীরের রক্ত ঘাম হয়ে ঝরে পড়ে ওরা যখন বলে প্রবাসীরা স্বার্থ্পর এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা থাকে না। এই কষ্ট প্রবাসীরা না পারে সইতে না পারে প্রকাশীতে নিশিদিন অন্তরে অন্তরে কেঁদে নিজেই নিজেকে শান্ত্বনা দিতে হয়।
যারা প্রবাসে বসবাস করেন, যাদের অবদান অনুদান সাহায্য সহযোগিতায় এই বাংলাদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটে আমি শুধু সেই দেশ প্রেমিক বাংলাদেশীর একজন, আমি জানি না বাংলাদেশের মানুষ প্রবাসীর দুঃখ কেউ বুঝবে কি বুঝবে না, না বুঝারই কথা তবে আমার উচিৎ সত্য প্রকাশ করা আমি সেটাই করে যাচ্ছি। আমি চাই সবাই জানুক আমাদের এক একটি দিন রাত কেমন করে কাটে। কেমন করে এই প্রবাসী মানুষগুলো নিরাশার মাঝে বেঁচে থাকে। যে দেশে জন্ম নিলাম, যে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তের আশায় আমরা প্রতিদিন যুদ্ধ করে যাচ্ছি, নিজে খেয়ে না খেয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করার জন্য দিন রাত মাথার ঘাম পায়ে ফেলি সেই দেশের মানুষ আমাদেরকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে মেনে নিতে পারে না।
বাংলাদেশের সরকার আমাদের অবদান স্বী্কার করলে কি আর না করলেই বা কি! সারা বিশ্বে্র মানুষ জানে প্রবাসী বাঙ্গালীর অবদান। ইতিহাস আমাদের কথা বলে, ইতিহাস আমাদের কর্মের সাক্ষী। আপন মানুষগুলো যখন আমাদের ঋন আস্বীকার করে তখনি কষ্ট হয়, এই কষ্ট আমাদেরকে মৃত্যু যন্ত্রনার মত এত শক্ত করে ধরে যেন হাউ মাউ করে কাঁদতে হয় । আজ পর্যন্ত আমাদেরকে ভোটের অধিকার দেয়া হয় নি। বাংলাদেশে সরকার আমাদের সাথে বিমাতা সুলব আচরন করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ তাই এই সব ভোটের অধিকার নিয়ে ভাবনার সময় নেই তবে ভাবতে গেলেই কষ্ট পেতে বাধ্য। ভোট সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অন্য এক সময় লিখবো, আজ দেশবাসীকে আরো কিছু অজানা কষ্টের সাথে পরিচয় করে দিতে চাই।
আমরা না পারি দেশ ছাড়তে না পারি দেশে থাকতে। বাংলাদেশের মানুষ আমাদেরকে যেমন বিলেতী বলে ডাকতে ভালোবাসে ঠিক তেমনি ইংরেজরা আমাদেরকে ইন্ডিয়ান বলে ডাকতে পছন্দ করে। (বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের তেমন কোন ধারনা নেই, তাই গায়ের রঙ দেখে আমাদেরকে ইন্ডিয়ান বলে থাকে) আমরা আসলে কেউ নই,য়ামাদের কোন নাম নেই, আমাদের কোন দেশ নেই, আমাদের সব থেকেও কিছু নেই। আমাদের চোখের জল ছাড়া আমাদের নিজস্ব বলতে আর কিছুই নেই। আমরা অবহেলিত চির অবহেলিত প্রবাসী। আমরা হলাম অনাথ। প্রবাসীদের জীবন হলো নীড়হারা পাখির মত। আমাদের কোন কিছু স্থায়ী নয়। আমাদের বুকের যন্ত্রনা বুঝার মত মানুষ নেই যে যেখানে গেলে আমাদের যন্ত্রনা কারো সাথে ভাগাভাগি করবো?
আমাদের কষ্ট হয় বা আমাদের চোখে জল ঝরে এই বিষয়গুলো অনেকেই বিশ্বাস করে না। আমাদের সব সুখ সবার জন্য তবে দুঃখের ভাগ শুধু আমাদের, এই দুঃখ কেউ নিতে চায় না। বিলেতে দুই প্রকার প্রবাসীরা আছেন। ১। যারা পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন। ২। যাদের কেউ নেই। যাদের কেউ নেই আমি তাদের কথাই লিখবো। ওরা বড় একা,বড় অসহায়। এই ভালবাসা বঞ্ছিত মানুষের কষ্ট আমি অনেক কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে কারন এক সময় আমি তাদের খুবই কাছাকাছি ছিলাম। দায়িত্বের পাহাড় মাথায় করে যারা বয়ে বেড়ায় দিনের পর দিন, অবহেলা অনাদরে যাদের নয়ন জল অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ে তারা আমার অতি আপনজন এই অবহেলিত মানুষগুলোকে আমি বড় বেশি ভালবাসি।
যে যন্ত্রনা একদিন আমার বুকে ছিল, যে কষ্ট আমি সহ্য করেছি বছরের পর বছর, এই কষ্টের সাথে কাউকে লড়াই করতে দেখলেই প্রানটা নিজের অজান্তে কেঁদে উঠে। এই কান্না আমি অনেক কেঁদেছি। প্রবাসের এক একটি মুহুর্ত যখন অনিশ্চয়তার মাঝে কাটে তখন জীবনকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়। স্বজনের বিরহ, মাটির বিরহ পৃথাবীর সব কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট। এই যন্ত্রনার সাথে যার পরিচয় হয় নি আমি বলবো জীবন সম্পর্কে তার কোন ধারনাই নেই। আপনজনের বিরহ কত যে যন্ত্রনার তা প্রবাসী জীবনের সাথে পরিচয় হবার পরই জানতে পারি। বাবা মা ভাই বোনের বিরহ অনুমান করে বুঝার কোন উপায় নেই। কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরির যখন ঘুমের কোলে আশ্রয় নেবার কথা ঠিক তখনই শুরু হয় বিরহের পালা।
মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের ভালবাসার জন্য বুক জুড়ে হাহাকার শুরু হয়। মনে পড়ে মায়ের আদরের এক একটি ক্ষন মুহুর্ত। বাবাকে ফাঁকি দিলে কেমন করে কাটগড়ায় দাড়াতে হত সব কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠে। বাবার রাগি রাগি চেহেরাটা দেখতে ইচ্ছে হয়। বুকের পাজর আস্তে আস্তে গরম হয় আবার ঠান্ডা হয়। জোর করে চোখের জল চোখে ধরে রাখা যায় না। অবাধ্য চোখের জল শত বাঁধা উপেক্ষা করে গন্ডবেয়ে গড়িয়ে পড়ে ইচ্ছেমত। চোট ভাই বোনের আদর, ওদের নিস্পাপ মুখের আদল দেখার জন্য হৃদয় মন বদ্ধ খাঁচার পাখির মত চটপট চটপট করতে থাকে। প্রবাসীর জীবন কান্না আর বিষাদে ভরা, আমাদের জীবন কষ্ট আর বিরহ দিয়ে গড়া। আমরা কষ্ট নামক দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। আমাদের কথা কী ভাল করে জানে না। কেউ আমাদের কথা জানতে চায় না।
একজন মানুষ যখন এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের মত হারিয়ে যায়, আমরা কিছুদিন কান্না কাটি করে এক সময় শান্ত হয়ে যাই। হারিয়ে যাওয়া সেই স্বজন বা পরিচিত মুখের কথা কোন এক সময় আমরা ভূ্লে যেতে পারি। চিরতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ভূ্লে যেতে যতেষ্ট সময় লাগে না। যারা এই পৃথিবী থেকে চলে যায় তাদেরকে ভূ্লে যাবার জন্য হৃদয় মন এক ধরনের প্রস্তুত হয়েই থাকে বলা যায়। ঠিক একই ভাবে আমরা যারা প্রবাসী আছি তাদের কথা দেশের মানুষ ভূ্লে যায়, প্রযোজন ছাড়া আমাদের সুখ দুঃখের কথা কেউ জানতে চায় না। জানি অনেকেই আমার এই লেখা পাঠান্তে কষ্ট পাবেন তবে বাস্তবকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি, দেশের মানুষকে ছোট করার জন্য এই কথা গুলো লিখিনি।
প্রবাসীদের কষ্ট বুঝাবার জন্য লিখছি। গত  ১৩ বছরের প্রবাস জীবন আমাকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছে। দেশ বিদেশের মানুষকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলে এই কথা গুলো জানতে পেরেছি।
একজন প্রবাসী যখন অকেজো হয়ে যায় তখনই পরিবার পরিজনের আসল রূপ প্রকাশ হয়, এর আগে নয়।
দুহাত ভরে যতদিন দেবার সামর্থ থাকবে ঠিক ততদিন পরিবারের সবার কাছে প্রিয়। আমাদেরকে সুখের মাইল ফলক হিশাবে দেখা হয়। দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনা আমাদের নিত্যদিনের সংগি। খোলা চোখে যা দেখা যায় তা দিয়েই আমাদেরকে সুখি মানুষ হিশাবে গন্য করা হয়, অথচ আমাদের বুখে জনমের শুন্যতা। একাকীত্ব প্রবাসী জীবন আমাদেকে মৃত্যুর আগে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে বাধ্য করে, এই যন্ত্রনা কাউকে বুঝানো যায় না, কষ্টের পাহাড় বুকে ধরে রেখেছি আমরা।
সুখটা কি শুধু কাড়ি কাড়ি টাকার মাঝেই সীমাবদ্ধ? কোন এক সময় আমিও তাই ভেবেছি যে টাকা পয়সা হাতে আসবে, নিজের মত করে জীবনকে সাজাবো, কষ্ট ভরা জীবনে আর কোন কষ্ট থাকবে না। সুখী সুন্দর একটা জীবনের জন্য টাকার প্রযোজনীয়তা অস্বী্কার করা যায় না তবে টাকাই যে সব সুখের মুলের মুল তা অনেকটা ভুল প্রমানিত হয়ে গেল। শুধু টাকা দিয়েই সুখী সুন্দর জীবন রচনা করা যায় না। আমার মত লক্ষ লক্ষ প্রবাসী এক বাক্যে এক মত হবেন, টাকাই সব সমস্যার সমাধান নয়। বিশেষ করে প্রবাসী জীবনের বাস্তবতা তো এই কথা বলে না। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে দেখা স্বপ্নের সাথে আজকের এই প্রবাসের কোন যোগসূ্ত্র নেই।
কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যখানে আকাশ পাতাল ব্যাবধান, কল্পনার রাজ্যে বেহিসাবী হতে কোন বাধা নিষেধ নেই, স্বপ্ন দেখতে কোন টাকা পয়সা লাগে না তাই ইচ্ছেমত কল্পনার টাকার মাঝে জীবনের সব সুখ খুঁজেছি। টাকা পয়সা ছাড়া একটা সুতাও হয় না তাও জানি তবে টাকার মাঝেই যে সব সুখ লুকিয়ে থাকে তাও সত্য নয়।
স্ব্পন আর বাস্তবের ব্যাবধান না বুঝে সংসারের জন্য একটু সুখ আর হাসি কিনতে গিয়েই আমাদের জীবনের প্রতিটি সুখ প্রবাসের মাটিতে কেঁদে কেঁদে মরে যায় যা কেউ জানতে পারে না।
দেশের আপনজনকে এই কষ্টের কথা এই যন্ত্রনার কথা জানতে দেই না, যাদের সুখের জন্য এত ত্যাগ এত অবহেলা অনাদর সহ্য করেছি সেই ভালবাসার মানুষগুলোকে কেমন করে কষ্টের কথা বলা যায়? কষ্ট আর যন্ত্রনার কথা বুক ভরা আশা নিয়ে বসে থাকা আপনজনকে বলা যায় না। যে সুখের জন্য এত দৌড় ঝাঁপ দিলাম, মা মাটি ছেড়ে অন্য এক ভূবনের বাসিন্দা হলাম, সেই সুখ নামের সোনার হরিণ তো আমাদের জীবনে এলোনা। হিসাবের কিছু সুখ যাহা অবশিষ্ট ছিল তাও আস্তে আস্তে হাতছাড়া হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই জীবনটা থেমে গেছে, এই যন্ত্রনা কাউকে বুঝানো যায় না। দিনরাত হাড়ভাংগা খাটুনি খেটে ঘরে ফিরে নিজেকে বড় আসহায় লাগে। এতটুকু আদর ভালবাসার জন্য মন চটপট করে মরে। আমাদের বেশির ভাগ প্রবাসীর মা নেই বাবা নেই আপনজন বলতে তেমন কী নেই যে আমাদেরকে একটু ভালবাসার কথা বলবে আমাদের কষ্টের সময় একটু সহানুভূতি দেখাবে।
একাকীত্বে্র বেদনায় আমাদের নয়নে যখন জল ঝরে কেউ আদর করে কাছে ডেকে এই জল মুছে দেয় না। নয়নের জল নয়নেই শুকায়। প্রবাসী যান্ত্রিক জীবনের সাথে যুদ্ধ করে আমরা প্রানে বেঁচে থাকি তবে এই বাঁচাকে বেঁচে থাকা বলা যায় না। আমাদের এই যান্ত্রিক জীবনের এক একটি মূহুর্ত অসম্ভব বেদনাদায়ক।
এই কষ্ট বেদনা বিরহ সহ্য করে, আমাদেরকে নতুন ভাবে শক্তি সঞ্চয় করে, অনিচ্ছাকৃ্ত এই প্রবাস জীবনের সাথে সন্ধী করে বেঁচে থাকতে হয় কারন এক ঝাক ভালবাসার মানুষ আমাদের পানে চেয়ে আছে। আমাদের ত্যাগ আপনজনকে সুখী সুন্দর কিছু মূহুর্ত দিতে সক্ষম তা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া তাই সব দুঃখ যন্ত্রনা ভূ্লে দায়িত্ব পালনে মরিয়া হয়ে উঠি। ভাইয়ের আবদার বোনের আবদার পূ্রন করতে গিয়ে নিজের পানে চেয়ে দেখার সময় থাকে না। মাসের শেষে দেশে টাকা পাঠাতে হয়, যতক্ষন বেঁচে থাকবো এই দায়িত্ব থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। অনেক সময় মাসের শেষে টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না দেশ থেকে ফোন আসে  শুধু কষ্টের কথা, প্রান হু হু করে কেঁদে উঠে, ধার দেনা করে সংসারের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হয় যা একমাত্র প্রবাসীরাই জানেন। আজ এখানেই শেষ করলাম পরে অন্য  র্পবে লিখবো ইন-শা-আল্লাহ ।
সময়নিউজ২৪.কম/ বি এম এম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *