শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখার নিয়ম (বিস্তারিতসহ)

অনলাইন ডেস্ক:

রোজা মানুষের গুনাহমাফির মাধ্যমে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। রোজার মাধ্যমে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমান ব্যক্তি যাতে শুধু মাহে রমাদানের ফরয রোজা রেখে থেমে না যান, বরং তিনি কীভাবে সহজেই পূর্ণ বছরটা মহান আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় বান্দা ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে থাকতে পারেন এবং কী করে চিরস্থায়ী জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারেন এবং পরকালে তিনি কীভাবে সফলকাম থাকতে পারেন রাসূলুল্লাহ সাঃ উম্মতের সামনে এই পথ সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। শাওয়াল মাসের ছয়টি নফল রোজা পালন সারা বছর রোজার সওয়াব প্রাপ্তির এমনি একটি পরম সুযোগ এনে দেয়। রাসূল সাঃ বলেন, হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, যে ব্যক্তি রমাদান মাসের রোজা রাখল এবং এরপরে শাওয়াল মাসে ৬টি রোজা রাখল সে যেন সারা বৎসর রোজা রাখল।


শাওয়াল শব্দের বিশ্লেষণ : পবিত্র রমাদানের পরবর্তী মাস এবং চন্দ্র মাসের দশম মাস হচ্ছে শাওয়াল মাস।  শাওয়াল শব্দটি ‘শাওলুন’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে- বের হওয়া। যেহেতু এ মাসে আরববাসী আনন্দ-উল্লাসের জন্য ভ্রমণে বের হয় এজন্য শাওয়ালকে শাওয়াল বলা হয়। (গিয়াসুল্লুগাত-২৮৭)
শাওয়ালের আমল : শাওয়াল মাসে অনেক আমল রয়েছে এসব আমলের ফজীলতও অনেক বেশী। এ মাসের গুরত্বপূর্ণ একটি আমল হচ্ছে শাওয়ালের ‘ছয় রোজা’। রমজানের ফরয রোজা পালনের পর শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা মুস্তাহাব। আর এ রোজাকে শাওয়ালের ছয় রোজা বলে। এই রোজার অনেক ফজীলত রয়েছে যা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল আকরাম সাঃ নিজে এ রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে ক্বেরামগণকে ও রাখার জন্য নির্দেশ দিতেন।
শাওয়ালের রোজার ফজিলত : এই রোজার ফজীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাঃ হাদিসের মধ্যে ইরশাদ করেন, “যারা মাহে রমজানের ফরজ রোজা রাখবে, অতঃপর মাহে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখবে তারা সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জন করবে। (মুসলিম শরীফ :১ম.খ- ৩৬৯ পৃ:)
হযরত মুসলিম কারশী রাঃ হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাঃকে জিজ্ঞেস করলাম সারা বছর রোজা রাখা সম্পর্কে; রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন তোমার উপর তোমার পরিবার-পরিজনের হক রয়েছে। অতঃএব তুমি রমাদান মাস ও এর পরবর্তী মাস তাতে রোজা রাখবে এবং প্রত্যেক বুধবার, বৃহস্পতি বার রোজা রাখবে। আর যখনই এরূপ করলে যেন সারা বছর রোজা রাখলে। (আবু দাউদ, তিরমিযি: হাদীস নং-৭৪৮)
এই হাদিসে বলা হয়েছে যে, রমযানের রোজা রাখার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যাবে। এই সওয়াব এভাবে যে, মহান রাব্বুল আলামিন মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কারীমের সূরায়ে আন-আমের ১৬০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, “যে লোক একটি নেক কর্ম আঞ্জাম দিবে সে লোক দশগুণ বেশী সওয়াব পাবে। সে হিসেবে রমযানের ত্রিশ রোজায় তিনশত রোজার সওয়াব হয়। আর মাহে শাওয়ালের ছয় রোজায় ষাট রোজার সওয়াব হয়। এভাবে রমজানের ৩০ রোজা এবং শাওয়ালের ৬ রোজা মোট ৩৬ রোজা দশ দিয়ে গুণ দিলে ৩৬০ রোজার সমান হয়ে যায়, আর ৩৬০ দিনে এক বছর। সুতরাং ৩৬ টি রোজায় সারা রছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়।
এ ছাড়া শাওয়ালের ছয় রোজা রাখার আরও ফায়দা হচ্ছে- অবহেলার কারণে অথবা গুনাহর কারণে রমযানের রোজার উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে সেটা পুষিয়ে নেয়া। কেয়ামতের দিন ফরয আমলের কমতি নফল আমল দিয়ে পূরণ করা হবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কেয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন: আমাদের রব ফেরেশতাদেরকে বলেন অথচ তিনি সবকিছু জানেন- তোমরা আমার বান্দার নামায দেখ; সেকি নামায পূর্ণভাবে আদায় করেছে নাকি নামাযে ঘাটতি করেছে। যদি পূর্ণভাবে আদায় করে থাকে তাহলে পূর্ণ নামায লেখা হয়। আর যদি কিছু ঘাটতি থাকে তখন বলেন: দেখ আমার বান্দার কোন নফল নামায আছে কিনা? যদি নফল নামায থাকে তখন বলেন: নফল নামায দিয়ে বান্দার ফরজের ঘাটতি পূর্ণ কর। এরপর অন্য আমলের হিসাব নেয়া হবে। (সুনানে আবু দাউদ)
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, প্রিয় নবী (সাঃ) আরও ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ তায়ালা শাওয়াল মাসের ৬ দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ওই ৬ দিন রোজা রাখবে আল্লাহ্ তায়ালা প্রত্যেক সৃষ্টি জীবের সংখ্যা হিসাবে তার আমলনামায় নেকি লিখে দেবেন, সমপরিমাণ গুনাহ দূর করে নেবেন এবং পরকালে তার দরজা বুলন্দ করে দেবেন। হযরত সুফিয়ান ছাওরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মক্কায় তিন বছর ছিলাম। মক্কাবাসীর মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি প্রত্যহ  যোহরের সময় মসজিদে হারামে এসে বায়তুল্লাহ তওয়াফ করে, নামাজ পড়ে আমাকে সালাম দিয়ে চলে যায়। ফলে তার ও আমার মাঝে হৃদ্যতা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি হলো। হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে ডাকল এবং বলল, আমি মারা গেলে তুমি আমাকে নিজ হাতে গোসল দেবে, নামাজ পড়বে এবং দাফন দেবে। ওই রাতে তুমি আমাকে কবরে একাকী রেখে চলে আসবে না। তুমি আমার কবরের কাছে রাত যাপন করবে এবং মুনকার নকিরের সওয়ালের সময় আমাকে সহায়তা করবে। সুতরাং আমি তাকে নিশ্চয়তা দিই। আমি তার আদেশ মোতাবেক তার কবরের কাছে রাত যাপন করি। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম। হঠাৎ ঘোষকের ঘোষণা শুনলাম, হে সুফিয়ান! তোমার রক্ষণাবেক্ষণ ও তালকিনের প্রয়োজন নেই। আমি বললাম, কিসের জন্য? তিনি বললেন, রমজানের রোজা এবং রমজান-পরবর্তী শাওয়ালের ৬টি রোজার কারণে। আমি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। অজু করে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। অতঃপর আমি আবার একই স্বপ্ন দেখলাম। সুতরাং আমি উপলব্ধি করলাম যে, এটা আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে নয়। সুতরাং আমি চলে গেলাম এবং বলতে লাগলাম, হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে রমজানের রোজা এবং শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখার তৌফিক দান করুন।

সময়নিউজ২৪.কম/ এ এস আর  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *