শুধু হিন্দু প্রধান নয় হিন্দুদেরই ছিলো সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহনের চ্যালঞ্জ

 
SSL Certificate for just $8.88 with Namecheap

উজ্জ্বল রায়:

প্রাচীন যুগের বঙ্গ বলতে যা বোঝাতো, অর্থাৎ বর্তমানের-বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ-আসামের কিছু অংশ ও ত্রিপুরা এবং মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের কিছু অংশ-এই সমগ্র এলাকাই শুধু হিন্দু প্রধান নয়, হিন্দুদেরই ছিলো; কারণ, সম্রাট অশোক কর্তৃক বৌদ্ধধর্ম গ্রহনের আগে এই পুরো এলাকায় কোনো বৌদ্ধ বা মুসলিম জনবসতি ছিলো না। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে সম্রাট অশোক কর্তৃক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ এবং প্রচারের ফলে শুধু বঙ্গেই নয় সমগ্র ভারত, অর্থাৎ বর্তমানের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার এবং আফগানিস্তান, নেপাল ও ভুটান-এই সমগ্র এলাকার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জন গোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করে ফেলেছিলো।

এই পরিস্থিতিতে ৭০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শংকরাচার্য, কুমারিল ভট্ট এবং এরকম আরো কয়েকজনের প্রচেষ্টায়- বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও নেপাল ভূথ-ে হিন্দু ধর্ম আবার পুণঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সিস্টেমটা ছিলো-বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে সনাতন ধমের উক্ত ধর্মগুরুরা চ্যালেঞ্জে আসে যে, খোলামাঠে ধর্ম নিয়ে রক্তপাতহীন যুক্তি-তর্ক হবে, যদি হিন্দুরা পরাজিত হয়, তাহলে ঐ এলাকার অবশিষ্ট সকল হিন্দু বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করবে, আর যদি বৌদ্ধরা পরাজিত হয়, তাহলে তাদেরকে আবার সনাতন ধর্মে ফিরে আসতে হবে; বলা বাহুল্য সনাতন ধর্মের ধর্মগুরুদের সাথে বৌদ্ধরা কোনোদিনই জিততে পারে নি, এভাবে ঐ পুরো এলাকার বৌদ্ধরা আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে আসে।

শংকরাচার্য ছিলেন পশ্চিমভারত অর্থাৎ গুজরাটের মানুষ, তার জীবনকালও ছিলো অল্প, মাত্র ৩২ বছরের, এই কারণেই হোক বা দূরত্বের কারণেই হোক, তারা আমাদের এই বঙ্গে এসে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে যুক্তি-তর্কে তারা লিপ্ত হতে পারেন নি, এই কারণে বঙ্গের বৌদ্ধরা আর হিন্দু ধর্মে ফিরে আসে নি, সেই সময় থেকেই বঙ্গে বৌদ্ধ ও হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত ছিলো ৬০:৪০।

এই পরিস্থিতি চলে ১২০০ সাল পর্যন্ত। এর মাঝে আবার বঙ্গের শাসনভার বৌদ্ধ পাল বংশের থেকে আসে হিন্দু সেন বংশের কাছে। শেষে ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজি যখন বিহার ও বঙ্গ আক্রমন ক্#৩৯;রে দখল করে, তখন সমগ্র বাংলার বৌদ্ধ ও হিন্দুরা একই সাথে বখতিয়ার খিলজির মুসলিম শক্তির সম্মুখীন হয় এবং বৌদ্ধরা পরাজিত হয়ে বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, যার প্রকৃত নাম সোমপুর বিহার, কুমিল্লার ময়নামতি বিহার এবং ভারতের পাটনার নালন্দা বিহার ছেড়ে, তাদের কিছু বই পুস্তক নিয়ে জীবিত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পালিয়ে চলে যায় নেপাল-ভুটানে, এই কারণেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ ;চর্যাপদ্ যা ছিলো বৌদ্ধভিক্ষুদের সাধন সঙ্গীত, তা আবিষ্কৃত হয়েছিলো নেপাল থেকে।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ বৌদ্ধরা মুসলিম আক্রমনকে ঠেকাতে না পেরে এবং এক এলাকার হিন্দু ও বৌদ্ধদের উপর অত্যাচারের কাহিনী শুনে অন্য এলাকার বৌদ্ধরা, বাঁচার জন্য দলে দলে ইসলাম গ্রহন করে মুসলমান হয়ে যায়, এভাবে যারা মুসলমান হয়, তারা পরিচিত হয়  বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সবসময় ন্যাড়া মাথায় থাকতো, তাই তারা যখন মুসলমান হলো, তখন তাদেরকে ন্যাড়া মুসলমান নামে চিহ্নিত করা হলো; তাছাড়াও বৌদ্ধরা লুঙ্গি পড়ে থাকতো বলে বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের পোষাক লুঙ্গিই থেকে যায়, এসব তথ্যে সন্দেহ থাকলে একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন যে-লুঙ্গি, বার্মিজ ভাষার শব্দ এবং এখনো বার্মা বা মায়ানমারের বৌদ্ধদের প্রধান পোষাক লুঙ্গি এবং কোনোদিন কখনোই হিন্দুদের পোষাক লুঙ্গি ছিলো না।

বর্তমানে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু হিন্দু যে লুঙ্গি পরে, এটা ইসলামিক কালচারের প্রভাবে। যা হোক, মুসলিম আক্রমনে পড়ে বাংলার প্রায় সব বৌদ্ধ মুসলমান হয়ে যায়; কারণ, এই লোকগুলোর ধর্ম বিশ্বাস ছিলো দুর্বল, প্রথমে এরা হিন্দু থেকে বৌদ্ধ হয়েছিলো এবং পরে আবার বৌদ্ধ থেকে মুসলমান হয়; কিন্তু মুসলমান শাসকদের সেই অত্যাচার নির্যাতনের মুখে পড়েও বাংলার হিন্দুরা তেমনভাবে মুসলমান হয়নি, তারা অত্যাচারিত হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে, ক্ষেত্র বিশেষে জীবন দিয়েছে, কিন্তু ধর্ম ত্যাগ করে নি।

যে দু চার জন হিন্দু মুসলমান হয়েছে, তারা তা করতে বাধ্য হয়েছে মুসলমান শাসকদের প্যাঁচে পড়ে, যেমন বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ, তার সবগুলো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলো রাজা কন্দর্পনারায়নের ছেলেদের সাথে- জোর করে তাদেরকে মুসলমান বানিয়ে, এছাড়াও কিছু হিন্দু মুসলমান হয়েছিলো জিজিয়া কর না দিয়ে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য।

এভাবে বাংলার ৪০% এর মধ্যে প্রায় ৩৫% হিন্দুই তাদের ধর্ম রক্ষা করে বা করতে সমর্থ হয়। এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, বাংলাদেশের সব বৌদ্ধ যদি মুসলমান হয়েই যায়, তাহলে চট্টগ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এখনও অনেক বৌদ্ধ থাকার কারণ কী? মধ্যযুগে বাংলায় ইসলামিক ঝড়ের ফলে, প্রায় সমগ্র বাংলাদেশের লোকজনই ইসলামে দীক্ষিত হয়, সেই সময় দীক্ষিত হয় পুরো পাহাড়ী এলাকাও, কিন্তু ১৬০০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে মায়ানমার থেকে কোনো এ বৌদ্ধ ভিক্ষু এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার কোনো এক রাজাকে আবার বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করতে সমর্থ হয়, তার ফলেই ঐ এলাকার আবার সমস্ত প্রজা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয় এবং একারণেই চট্টগ্রাম এলাকায় এখনো অনেক বৌদ্ধের বাস। বাংলাদেশের প্রায় সব মুসলমান যে বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত, এই ইতিহাস বাংলার ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়েছে এবং এই ইতিহাসকে চাপা দেওয়ার জন্য মিথ্যা ইতিহাস লিখা হয়েছে যে, উচ্চবণের হিন্দুদের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে মুসলমান হয়েছে। কিন্তু এই ইতিহাস সম্পূর্ণ মিথ্যা।

মুসলিম শাসনামলে উচ্চ বর্ণের হিন্দু অর্থাৎ ব্রাহ্মণরাই হয়েছিলো সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত; কারণ, ব্রাহ্মণরাই ছিলো হিন্দু সমাজের মাথা, মুসলমান শাসকদের মনে এই বিশ্বাস ঢুকেছিলো যে, যদি ব্রাহ্মণদেরকে ধর্মান্তরিত করা যায়। আমার এই কথার প্রমান পাবেন রাজা রামমোহন রায়, তাঁর ্য়ঁড়ঃ;তুহফা-উল-মওয়াহিদ্দীন্য়ঁড়ঃ; গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে যা বলেছেন, তা জানলে, তিনি বলেছেন, ্য়ঁড়ঃ;ইসলামের অনুসরণকারীদের হাতে অনেক নির্যাতন ও পীড়ন সহ্য করিয়াও, এমন কি প্রাণ নাশের ভীতি প্রদর্শন সত্ত্বেও এই সব দৈব বিধানে বিশ্বাসী ব্রাহ্মণ সমাজের লোকেরা তাহাদের ধর্মমত বর্জন করেন নাই।্য়ঁড়ঃ; এখানে দেখা যাচ্ছে মুসলমান শাসকদের কাছে নির্যাতিত হয়ে ব্রাহ্মণদেরই প্রাণ নিয়ে টানাটানি,এই অবস্থায় তারা নিচুর জাতের হিন্দুদেরকে নির্যাতন করবে, এটা কি বাস্তব সম্মত ?

তবে ব্রাহ্মণরা, নিচু জাতের হিন্দুদেরকে যে একেবারে নির্যাতন করে নি, তা কিন্তু নয়, কিন্তু সেই নির্যাতন ফিজিক্যাল ছিলো না, ছিলো মেন্টাল; ধর্মশাস্ত্রের উপর নিজেদের আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা নিচু জাতের হিন্দুদের জন্য বেদ এবং এর মতো ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন নিষিদ্ধ করেছিলো বলে শোনা যায়, আর এই সূত্রকে কাজে লাগিয়েই নেহেরু মার্কা ইতিহাস রচয়িতারা এই কথা ইতিহাসের বইয়ে লিখে দিয়েছে যে, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম গ্রহন করেছে।

এটা যদি সত্য হয়, তাহলে ইতিহাসবিদদের কাছে আমার কয়েকটি প্রশ্ন- পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ছিলো সেই সময় এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়, এরপরেই ছিলো কুমিল্লার ময়নামতির স্থান এবং তারপর বগুড়ার মহাস্থান গড়, এ থেকে স্পষ্ট যে বাংলায় ব্যাপকহারে বৌদ্ধ জন বসতি ছিলো, সেই বৌদ্ধগুলো গেলো কোথায় ? কিভাবে বাঙ্গালি মুসলমানদের প্রধান পোষাক হয়ে উঠলো লুঙ্গি ? শুইন্যা মুসলমমান শব্দ গুচ্ছটির উৎপত্তি হয়েছিলো কিভাবে ? এবং মুসলমানদেরকে আড়ালে আবডালে কেনো এখনও ৩৯;ন্যাড়্৩৯; বলা হয় ? ইতিহাসের বইয়ে যা খুশি তা লিখলেই সত্য হয়ে যায় না, তার পেছনে যুক্তি এবং বাস্তব পরিস্থিতি থাকতে হয়।

ইতিহাস সম্পর্কে একটা কথা মনে রাখবেন, বাংলার পাঠ্যপুস্তকে সেই ইতিহাসই লিখা হয়েছে যা মুসলমানদের পক্ষে যায় বা যেই ঘটনায় তাদেরকে পজিটিভলি তুলে ধরা যায়; এটা করতে গিয়েও তারা সত্যকে চাপা দিয়ে অনেক মিথ্যা কথা লিখেছে, আর যেখানে কোনোভাবেই মুসলমানদেরকে পজিটিভ আকারে তুলে ধরা যায় নি, সেই ইতিহাসই তারা ডিলিট করে দিয়েছে, যেমন ১৯৪৬ সালের নোয়াখালির হিন্দু হত্যা, ১৯৫০ সালে ১ মাসে ৫০ লক্ষ হিন্দু বিতাড়ন, ভারত-পাকিস্তানের ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে হিন্দু বিতাড়ন এবং ১৯৭১ সালের ম্যাক্সিম্যাম হিন্দু নির্যাতনের ঘটনাগুলি। যা হোক, ভূমিকা ছেড়ে এবার মূল প্রসঙ্গে যাই, বাংলার হিন্দুরা, মুসলমনদের হাতে প্রথম মার খায় ১৯৪৬ সালে, কোলকাতায়। তখন অবিভক্ত বাংলার মূখ্যমন্ত্রী- মুসলমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সে নেহেরু-গান্ধী তথা

কংগ্রেসকে ভয় দেখিয়ে পাকিস্তান আদায়ের জন্য প্ল্যান করে কোলকাতায় ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে পালনের নামে নিরস্ত্র হিন্দুদের উপর হামলা করে, এই ঘটনায় প্রায় ২০ হাজার হিন্দু নিহত হয়, লুঠ হয় বহু হিন্দু বাড়ি ও দোকানপাট, ধর্ষণ ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরের চেষ্টা হয় অগিনত। ৩ দিন একতরফা হামলার পর হিন্দু বীর গোপাল পাঁঠার নেতৃত্বে অস্ত্র হাতে ঘুরে দাঁড়ায় হিন্দুরা, ফলে দ্রুত পুলিশ নামিয়ে দাঙ্গা বন্ধ করে মূখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী। হিন্দুরা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে এবং প্রতিশোধ হিসেবে কিছু মুসলমানকে খুন করতে পারে, এই অপমান সহ্য করা সম্ভব হয় না মূখ্যমন্ত্রীর দল মুসলিম লীগের, তারা আবার হিন্দুদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করে নোয়াখালি এ্যাটাকের, এই এ্যাটাকে নিহত হয় প্রায় ১ হাজার হিন্দু, ধর্ষিতা হয় বর্তমানের নোয়াখালি, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ১২ থেকে ৫২ এর সব হিন্দু মেয়ে, জোর করে ধর্মান্তিরত করা হয় প্রায় সবাইকে।

এরপর ভারত ভাগ হয় এবং সেই সময়ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় হত্যা করা হয় শত শত হিন্দুকে। তারপর পূর্ববঙ্গকে হিন্দু শুন্য করার পরিকল্পনা হিসেবে ১৯৫০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ৫০ লক্ষ হিন্দুকে এক কাপড়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়, এই ঘটনা ঘটাতে গিয়ে যে কী পরিমান অত্যাচার নির্যাতন হিন্দুদের উপর মুসলমানরা চালিয়েছে সেটা একবার কল্পনা করুন। তারপর ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধ, সবখানেই শিকার হিন্দুরা আর শিকারী হলো মুসলমানরা। ইতিহাসের এই ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করে দেখবেন, সবক্ষেত্রেই বিনা কারণে মুসলমানদের হাতে মার খেয়েছে হিন্দুরা। 

SSL Certificate for just $8.88 with Namecheap

সময় নিউজ২৪.কম/বি এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *