সাধুবাবার খাবার

 

উজ্জ্বল রায় 

সারাজীবন ধরে দেখেছি কপালের একটা ব্যাপার আছে। এমন অনেক পুরুষ আছে যাদের কপালে একটার পর একটা সুন্দরী জুটে যায় না চাইলেও। এমন অনেক মেয়েকে দেখেছি তাদের কপালে লাইন দিয়ে লেগে থাকে ছেলে। অনেক ক্ষেত্রে রূপ বা গুণটাও কোনও ব্যাপার না, কপালগুণেই জুটে যায়।

সারাজীবন পথ চলার অভিজ্ঞতায় দেখলাম আমার কপালে না জুটেছে কোনও সুন্দরী, না জুটেছে উপকারী কোনও পুরুষ। এটা একটা আমার মনকষ্টের কারণ। সাধুসঙ্গের সময় জিজ্ঞাসা করি, বাবা, আপনার জীবনে এমন কোনও সুখ বা দুঃখের ঘটনা কি আছে যা আপনার আজও স্মরণে আছে? আজ সাধুসঙ্গের সময় কোনও সাধু বা কেউ যদি ঠিক ওই প্রশ্নই ঘুরিয়ে আমাকে করে তাহলে আমার মনকষ্টের কারণ বলব ওটাই।

সুখের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলব, সারাজীবন আমার কপালে না চাইতেই জুটেছে সাধু আর সাধু, সঙ্গে তাদের ভিক্ষে করে পাওয়া রুটি। তখন মা আমার বেঁচে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির দুটি সংবাদপত্র গ্রুপে আমার লেখা চলছে।

পত্রিকা কিংবা বই লেখার কারণে গেছি হরিদ্বারে। একদিন ভাবলাম, যদি কখনও সাধু হই তাহলে ভিক্ষা করতে বসলে আমাকে কেউ ভিক্ষে দেবে কিনা একবার দেখা যাক। একটা নামাবলী আর হলুদ রঙের গামছা কিনলাম। ‘মিশ্রভবনে’ যেখানে আমি উঠি, সেখানে জামা কাপড় রেখে ঘর বন্ধ করে গামছা পরে গায়ে নামাবলী জড়িয়ে ‘হর কি পেয়ারি’-তে বসে গেলাম ভিখারিদের সঙ্গে। অর্থের সংস্থানের জন্য সামনে একটা স্থানীয় হিন্দি ‘দৈনিক জাগরণ’ বিছিয়ে।

এখানে একটা কথা বলি, আমার চেহারাটা একেবারেই ভিখারিমার্কা। বনেদি ও সম্ধসঢ়;ভ্রান্ত ঘরে যাদের জন্ম, তারা অত্যন্ত অভাবে থাকলে কিংবা অবস্থা পড়ে গেলেও চেহারায় বনেদিয়ানার রেশটুকু আমি কখনও মিলিয়ে যেতে দেখিনি। ভিখারি পার্টিরা যদি কখনও অর্থবান কিংবা সার্বিক যতই উন্নত পর্যায় যাক না কেন, চেহারায় বনেদিয়ানার ছাপ কিছুতেই আসে না। আসবে আমার মত ভিখারিয়ানার ছাপ।

এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনও উপায় আছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই। যাইহোক, সারাদিন ধরে ‘ভিক্ষা করব’ এই ব্রত নিয়ে বসে থেকে সন্ধ্যায় যখন ‘হর কি পেয়ারি’ থেকে মিশ্রভবনের পথে, তখন দেখলাম একটা মানুষের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য যেটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি পেয়েছি। সেদিন আমার একটা বিশ্বাস জন্মাল, ছোটবেলায় খুব অন্ন কষ্ট পেয়েছি, তাই পেটের জন্য চিন্তা একটা ছিল, সেদিন থেকে এই লেখা পর্যন্ত অন্নের চিন্তাটা সাধুদের মতো আমার আর কখনও হয়নি।

ভিক্ষাবৃত্তিতে বসে যে অভিজ্ঞতা হল এবার তা বলি। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে আমার পেতে রাখা খবরের কাগজে ভিক্ষারূপ যে টাকা ও খুচরো পয়সা পড়ল তা সবই অবাংলাভাষীদের হাত থেকে। সকাল থেকে সন্ধ্যার খানিক আগে পর্যন্ত একটা বাঙ্গালি তীর্থযাত্রীর একটা পয়সা, না আমার পাতে, না আমার মতো অন্য কোনও ভিখারি কিংবা সাধুদের পাতে পড়ল। আজ বুঝি, সাধুদের কেন খাওয়ার চিন্তা নেই আর কেউ কখনও সাধুজীবনে যে না খেয়ে নেই, ‘বেটা, কুছ না কুছ খানা মিল হি যাতা হ্যায়’ – একথার সত্যতা শিরা উপশিরায় উপলব্ধি করেছি।

ভ্রমণে একা চলায় যেমন সুখ আছে যথেষ্ট, অ-সুখও কিন্তু কম নয়। আমার খেয়েদেয়ে কাজ না থাকলে যেমনটা হয় আর কি! হরিদ্বারে সেবার ছিলাম পনেরো দিন। ঘুম থেকে উঠে গঙ্গার ওপার থেকে ঘুরে ‘হর কি পেয়ারি’ হয়ে ফিরে আসি নিজের ডেরা মিশ্রভবনে।

এখানে বিগত ত্রিশবছর ধরে বছরে তিন থেকে চারবার এসে উঠি। এইভাবেই কাটছে আমার দিনগুলো। একদিনের কথা। নজরে এল এক অতি বৃদ্ধ সাধুবাবা বসে আছেন হর কি পেয়ারিতে।

যারা ভোজনরসিক তারা বাজারে ঢুকলেই ঠিক ভালো মাছ বা সবজি টুক করে তুলে নেন নোটের পরোয়া না করে, আমি দেখামাত্র প্রণাম করে সাধুবাবাকে টুক করে গ্রহণ করি অন্তরে।সরাসরি পায়ের কাছে বসে পড়লাম ধুলোয় ভরা অঙ্গনে। হতবাক বৃদ্ধের মুখখানা অপলক হয়ে রইল আমার মুখের দিকে। হাসি হাসি মুখ করে বললাম। 

সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *