স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও স্বীকৃতি মেলেনি খোকনের বাবা-দাদার

রাজিবুল হক সিদ্দিকী, কিশোরগঞ্জ:

১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের সময় খোকনের বয়স তখন চার কি পাঁচ। সেদিনের নারকীয় দৃশ্যগুলো মনে থাকবে চিরকাল। বাড়িঘর পুড়ে ছাই করে দিয়েছিল হানাদাররা। গোটা পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল।সেদিনের শিশু খোকন চন্দ্র সাহার বাবা গোপাল চন্দ্র সাহা আর দাদা বল্লব চন্দ্র সাহাক হানাদারদের হাতে প্রাণ দিতে হলো। মৃত দেহগুলো কোথাও পাওয়া গেল না।অবশেষে খড়ের তৈরি ডামি মৃতদেহ দিয়েই দাহকার্য সম্পন্ন করতে হয়েছিল।

কথাগুলো আবেগতাড়িত কন্ঠে বলেছিলেন কিশোরগঞ্জ শহরতলির চরশোলাকিয়া সাহাপাড়ার খোকন চন্দ্র সাহা। তিনি আজও তার বাবা ও দাদার হত্যাকারীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান। সেদিনের শিশু খোকন সাহা এখন শহরের কালীবাড়ী মার্কেটে পান-সিগারেটের ব্যবসা করেন।

সেদিনের যেটুকু স্মৃতি তার মনে আছে, তার সঙ্গে অগ্রজদের বর্ণনা মিশিয়ে জানালেন, একাত্তরের ১৯ এপ্রিল পাক হানাদাররা প্রথমে কিশোরগঞ্জ শহরের আসার পর ব্যাপক ধংসযজ্ঞ চালায়। স্থানীয়
দোসরদের সহায়তায় খোকনদের বাড়ির চারটি ঘরসহ মালামাল পুড়ে ছাই করে দেয়।স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। নারকীয় তান্ডবে ভীত হয়ে খোকনদের গোটা পরিবার পালিয়ে আশ্রয় নেয় করিমগঞ্জের নিয়ামতপুরের খোকনের পিঁসির বাড়িতে। তখন প্রাণভয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষরা ধুতি আর বিবাহিত মহিলারা শাঁখা-সিঁদুর পরা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই তখন শহর ছেড়ে দিয়েছিলেন। কোন কোন পরিবার ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল।

আগস্ট (ভাদ্র) মাসে পাকিস্তানি মেজর ইফতেখার নতুন কৌশল আঁটে। মাইকে ঘোষণা প্রচার করতে থাকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের কোন ভয় নেই। এখন থেকে নির্ভয়ে পুরুষরা ধুতি আর মহিলারা শাঁখা-সিঁদুর পড়তে পারবেন। এই ঘোষণার ওপর ভরসা করে খোকনদের পরিবার আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সব নারী-পুরুষই তাদের নিজস্ব বেশভূষা ধারণ করতে শুরু করেন। এরই
মধ্যে একদিন খোকনের দাদা বল্লব চন্দ্র সাহাকে ধুতি পরা অবস্থায় স্থানীয় রাজাকাররা অভয় দিয়ে ডাকবাংলোতে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পরই আবার খোকনের বাবা গোপাল চন্দ্র সাহাকে রাজাকাররা জানায়, আপনার বাবার
কোন সমস্যাই হয়নি, আপনিও চলুন। এ কথা শোনার পর সরল বিশ্বাসে গোপাল সাহাও ডাকবাংলোতে গেলেন। একইভাবে খোকনদের প্রতিবেশী চুনীলাল সাহা এবং পরিমল সাহাকেও নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এটাই ছিল তাদের শেষ যাওয়া। আর তারা বাড়ি ফেরেননি। আরও অনেকের সঙ্গে তাদের অজ্ঞাত স্থানে হত্যা করা হয়।

তখনকার পরিচিত বধ্যভূমি ধুলদিয়া রেল সেতু এবং কালীগঞ্জ রেল সেতু এলাকায় বহু খোঁজাখুজি করে তাদের লাশগুলো আর পাওয়া গেল না। ধর্মীয় বিধান মেনে সৎকারও করা গেল না। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর বাড়িতে খড় দিয়ে খোকনের বাবা আর দাদার ডামি মৃতদেহ তৈরি করে সেগুলোকে ধর্মীয় বিধান মতে শ্মাশানঘাটে দাহ করা হয়।

আজও প্রতি বছর ভাদ্র মাসে অমাবস্যার তিথিতে তাদের স্মরণে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। খোকন সাহা আরও জানান,মুক্তিযুদ্ধকালে শহরের পুরানথানা এলাকায় তাদের নিজস্ব দোকানঘর ছিল। বাবা আর দাদা তাতে পান-সুপারির ব্যবসা করতেন। সেই দোকান ঘরটি ইলিয়াস নামে স্থানীয় এক রাজাকার দখল করে নেয়। কিশোরগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর রাজাকার ইলিয়াস
মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। কিন্তু খোকনদের দখল হয়ে যাওয়া দোকানটি এখনও ইলিয়াসের স্ত্রী দখল করে আছে বলে খোকন সাহা জানান।

খোকনরা ২ ভাই আর বোনকে এখনো সেদিনের সব দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে খোকন সাহা
তার দাদা আর বাবার হত্যাকারীদের পাশাপাশি সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারসহ বাবা ও দাদার শহীদের স্বীকৃতি চান। তাহলেও হয়তো মনে একটু স্বস্তি আসবে বলে তিনি মনে করেন।

সময়নিউজ২৪.কম /বি এম এম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *