১লা বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম দিন-কাজী মোরশেদ আলম

দিনের পর আসে আরেকটি নতুন দিন। তেমনি সপ্তাহের পর আসে নতুন সপ্তাহ, মাসের পর আসে নতুন মাস এবং বছরের পর আসে নতুন বছর। আরবি ও ইংরেজিতে যেমন আছে মাস, বছর এবং দিন। তেমনি আমাদের অর্থাৎ বাঙ্গালীদেরও আছে বাংলা বছর যা মুঘল সম্রাট মহামতি আকবর প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন হিজরি সনের প্রথম মাসে। হিজরি সন হচ্ছে ঘুর্ণায়মান। বছরের বিভিন্ন সময় হিজরি সনের প্রথম মাস হত। কৃষকদের ফসল যখন উৎপন্ন হত না তখনও হিজরী সনের প্রথম মাস এসে হাজির হত। কখনওবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় হিজরির প্রথম মাস হত। ফলে কৃষকরা সময়মত কর দিতে ব্যার্থ হতো। সম্রাট আকবর এসব সমস্যা সমাধান কল্পে এগিয়ে আসেন এবং তার সময়ের নামকরা বিখ্যাত প-িত ফয়েজ উল্লাহ সিরাজীকে নির্দেশ দেন নতুন একটি ক্যালেন্ডার তৈয়ার করার জন্য। প-িত ফয়েজ উল্লাহ ভেবে চিন্তে নতুন একটি ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করেন যা ফসলি সন নামে পরিচিত। নতুন ক্যালেন্ডারটিতে ১২টি মাস এবং ছয়টি ঋতু ধার্য করা হয়েছে। আরবী হিজরী সালের সাথে মিল রেখে ক্যালেন্ডারটি প্রস্তুত করা হয়।

ক্যালেন্ডারটি চালু হয় ইংরেজি ১৫৫৬ সালে। তখন হিজরি সন ছিল ৯৬৩।বৈশাখ হচ্ছে বাংলা বছরের ১ম মাস এবং ১লা বৈশাখ হচ্ছে প্রথম দিন। ১লা বৈশাখে ডাকঢোল পিটিয়ে অত্যাধিক আনন্দঘন পরিবেশে বিলাস বৈভবে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়। ১লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমরা আমোদ-প্রমোদ ও আনন্দ-ফুর্তি অবশ্যই করব। এ আনন্দ-ফুর্তিতে কতটুকু শালীনতা বজায় রাখতে পেরেছি তা ভেবে দেখতে হবে। তবে শালীনতা বজায় রাখা একান্ত আবশ্যক বা অপরিহার্য।

১লা বৈশাখ সকল শ্রেণির লোকদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের নিকট ১ লা বৈশাখ এক অভূতপূর্ব এমন একটি আকাংখিত দিন যার কদর সীমাহীন।ব্যবসায়ীরা হাল খাতার মাধ্যমে ক্রেতাদের পাওনা আদায়ের মহাউৎসবে মেতে ওঠে। উৎসবের মধ্য দিয়ে বাকী আদায়ের চেষ্টা করেন এবং সফলকামও হন শতভাগ। ক্রেতারাও ১লা বৈশাখের পর তাদের বাকী টাকা রাখতে চাননা। ১লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রামে গঞ্জে মন মুগ্ধকর পরিবেশে শুরু হয় মেলা।

ছোট বড় সকল বয়সের লোকদের নিকট স্বস্তিদায়ক আনন্দের খোরাক যোগায় এই জমজমাট বৈশাখি মেলা। বিশেষ করে বড় বড় গাছের নীচে আরাম্ভ হয় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নতুন বছরকে বরণ করে নেয় বিভিন্ন আনন্দ উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে। আনন্দ উৎসব দেহ মনকে সতেজ করে। ফলে কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পায়। তবে এমন আনন্দ উৎসব করা ঠিক না যা আমাদের বিবেককে ব্যাপক ভাবে নাড়া দেয়।

বরাবরাই পরিলক্ষিত হয় যে, নববর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বেষ্টনীকে উপেক্ষা করে অপসংস্কৃতি প্রবেশ করানো হচ্ছে আমাদের মার্জিত সংস্কৃতিতে। যা কোন ভাবেই গ্রহণ করা ঠিক হচ্ছেনা। যে সমস্ত আচার আচরণে তরুণ তরুণীরা মেতে উঠে তা অবৈধ আনন্দপূর্ণ কিন্তু স্বস্তিদায়ক নয়। যা আমাদের সমাজ কিছুতেই গ্রহণ করেনা। এ সমস্ত আচার আচরণের প্রতি ধিক্কার জানানো উচিত।

তরুণ তরুণীরা বটমূলে পার্কে বা কোন দর্শনীয় স্থানে ভিড় করে। এমন পোষাক পরিচ্ছেদে তারা সজ্জিত হয় যা সম্পূর্ণরূপে বেমানান। এক কথায় সেক্সী পোষাক বলা যেতে পারে। ছেলেরা মেয়েদের কপালে লাল টিপ দিয়ে দেয়, হাতে হাত ধরে নাচানাচী করে যা মেধাবী ছাত্রদের ইভটিজিংএ উৎসাহিত করে।

এ ধরনের অপসংস্কৃতি ও বেমক্কা আচরণ যে কোন মূল্যে ঐক্যমত ভিত্তিতে আশু সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।আমাদের মনে রাখতে হবে ইচ্ছকৃত অহেতুক বাড়াবাড়ী ভালনা।নববর্ষ উপলক্ষে আমরা বাজার থেকে বড় বড় মাছ ক্রয় করি। নতুন নতুন পোষাক পরিচ্ছেদ পছন্দ অনুযায়ী কিনে নেই। ঘর বাড়ী দোকান পাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করি। তা কোন মতেই দোষের নয়।এগুলো আমাদের এখন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বছরের ১ম দিনে উন্নত মানের খাবার খাওয়া, নতুন নতুন পোষাক পরিচ্ছেদ পরিধান করা, ঘর-বাড়ী, দোকান পাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এগুলো হচ্ছে উন্নতমানের সংস্কৃতি। সকল ক্ষেত্রে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা পবিত্রতার পরিচয় বহন করে। পবিত্রতা হচ্ছে ঈমানের অংগ।

নববর্ষকে ঘিরে কিছু কুসংস্কারও আমাদের মাঝে দেখা যায়। এ দিনে আইশযুক্ত বড় মাছ খেতে হবে, না খেলে সারা বছর না খেয়ে থাকতে হবে। এমনকি সারা বছর মাছ খাওয়া ভাগ্যে জুটবেনা।এটি একটি নিছক কুসংস্কার। এর কোন ভিত্তি নেই। আমাদের যে নিজস্ব সংস্কৃতি আছে তার স্ফুরণ ঘটাতে হবে নববর্ষে। বাংলার যে ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে তা প্রদর্শন করতে হবে এই দিনে। কিছুটা হলেও আমাদের এ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা তা দর্শন করে গ্রাম্য পরিবেশ আশ্বাদন করতে পারবে। এ নববর্ষে আয়োজন করা যেতে পারে আমাদের কিছু নিজস্ব খেলা যেমন হাডুডু, কানা মাছি, দাড়িয়া বান্দা ইত্যাদি খেলা।

মেলায় স্থান দেওয়া যেতে পারে বাঙালীদের এক সময়ের ঐতিহ্য মসলিন কাপড়, নকসী কাথা, ঢেকি আরোও বিলুপ্ত অনেক কিছু। এ সমস্ত আয়োজনের লক্ষ্যে আমাদের সমাজে সংস্কৃতি মনা লোক থাকা একান্ত প্রয়োজন।

২০১১ইং সালে চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা গাউছুল আজম পাইলট হাইস্কুল প্রাঙ্গনে দু’দিন ব্যাপি ব্যতিক্রমিক মেলার আয়োজন করে চমক দেখিয়ে দেন। তিনি সাধারণ মানুষের সারিতে এসে যে ভাবে নববর্ষকে বরণ করে নিলেন তা হাজীগঞ্জবাসী ভুলবেনা।

তিনি হাজীগঞ্জবাসীর কাছে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন বৈশাখের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এ ধরনের সংস্কৃতিমনা লোক বাংলাদেশে অবশ্যই দরকার আছে বাংলা সংস্কৃতি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে। বিবর্জিত ঐতিহ্যকে যারা লালন করছে রঙ্গিন মোড়কে। তাদের কাছে আমার আকুতি আপনারা ভালো হয়ে যান। রূপকথার গল্পে কল্পিত রাণীর ঘরে জন্ম নিয়েছিল অদ্ভুদ প্রাণীর বাচ্চা। অবশ্যই এটি এটি একটি নিছক কল্পকাহিনী অকপটে করছি স্বীকার। আমাদের যে সংস্কৃতি রয়েছে সেই সংস্কৃতিই আমাদের মাঝে প্রকাশিত হবে। আমরা কেন জন্ম দেব পরিত্যক্ত ঐতিহ্য। মানুষের গর্ভে মানুষই জন্ম নেয়। কোন রূপকথার গল্পের মতন কোন অ™ু¢দ বাচ্চা জন্ম নেয় না। তবে আমরা কেন অদ্ভুদ বাচ্চার জন্মের মত অদ্ভুদ সংস্কৃতি জন্ম দেব?

নববর্ষে কামনা করছি যত আবর্জনা, জড়া ময়লা, পরিত্যাক্ত নিকষ অন্ধকার, অহেতুক জঞ্জাল দুর হোক আমাদের সন্নিকট থেকে। বিরাজ করুক শান্তি শৃঙ্খলা, মায়া মমতা, ভালবাসা এবং একে অপরের প্রতি সহনশীলতা। অবসান হোক হানাহানি, চাঁদাবাজি, ছাত্র রাজনীতির বেলেল্লাপনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা,বিপদগামী সাংবাদিকদের অবৈধ কার্যকলাপ, মাদকতার চোরা চালানী এবং মাদক ব্যবহারের প্রসারতা।

যাতে আমাদের সমাজে আমাদের দেশে জন্ম নেয় অনবদ্য স্বচ্ছ পরিবেশ, যে পরিবেশে আমরা বসবাস করে আমাদের জীবন আমাদের মন সুখি সমৃদ্ধ করতে পারব।

সময়নিউজ২৪.কম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *