মাসুদ রানা,মোংলাঃ
আকাশে মেঘ আর পশুর নদীর পানি একটু ফুঁসলেই নির্ঘুম রাত কাটে মোংলার পশুর নদীর তীরবর্তী ১০ গ্রামের মানুষের। কয়েকটি ইউনিয়নের বিপুল সংখ্যক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। নদী সংলগ্ন হলেও ঝড় জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য এ অঞ্চলে নেই কোন বেড়িবাঁধ। যার ফলে এসব এলাকার বেশিরভাগ মানুষকে বসবাস করতে হয় জোয়ার ভাটার নিয়ম মেনে। এ নদীর স্রোত আর ভাঙ্গন কেঁড়ে নিচ্ছে জনবসতি, মাথা গোজার ঠাই বসতভিটাও । জোয়ার-ভাটার হলি খেলায় সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অসংখ্য পরিবার। বেড়িবাঁধ না থাকায় নদী সংলগ্ন এলাকার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি।
সুন্দরবনের বুকচিরে বঙ্গোপসাগর মিশেছে মোংলা পশুর নদী। এ নদীটি উজানে ছুয়েছে একপাড়ে মোংলা উপজেলা। আর অপর পাড়ে খুলনার দাকোপ উপজেলার অবস্থান। পশুর নদী ছাড়াও বনের আরেক প্রান্ত হতে বয়ে আসা শাখা নদী শ্যালা ও মোংলা-ঘষিয়াখালী নদী প্রাকৃতিক ভাবে ঘিরে রেখেছে মোংলার জনপদ। এ  উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে চিলা, চাঁদপাই ও বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়ন ছুয়ে গেছে ওই তিনটি নদী। আর এসব ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রাম প্রতিনিয়ন জোয়ারের পানিতে ডুবছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। উন্নয়ন ও জনগণের জান মালের নিরাপত্তার জন্য উপকূলীয় জনপথে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে সরকার। কিন্তু নদীর সংলগ্ন হওয়া স্বত্বেও মোংলার কোন জায়গাতেই সরকারীভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।
একটি বেসরকারি সংস্থা প্রায় একযুগ আগে দেড় কোটি টাকা ব্যায় পৌর শহরের সীমান্ত  থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ের জয়মনির ঘোল পর্যন্ত আংশিক বেড়িবাধ নিমার্ণ করে। বিশেষ করে চাদপাই ইউনিয়নের কানাইনগর আবাসন এলাকা থেকে শুরু করে জয়মনির ঘোল শ্যালার নদীর মোহনা পর্যন্ত বেড়িবাধের অবস্থা এখন বড়ই করুণ। কাইননগর থেকে চিলা খাল পর্যন্ত যে বাধ নিমার্ণ করা হয়েছিল এখন সেই বাধের চিহ্নও নেই। কোথায় কোথায় বাধের সীমা রেখা একহাত কিংবা একবিলাস্তের মতো টিকে আছে। এ অবস্থায় পশুর নদী তীরবর্তী এলাকার  মানুষের দুঃখ দূর্দশার যেন শেষ নেই । এসব এলাকায় চলাচলের জন্য সড়ক পথও তেমন উন্নত নয়।
নদী সংলগ্ন এলাকার মানুষকে ঝড় জলোচ্ছ্বাস ও লবণ পানির হাত থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন মন্ত্রণালয়ে। মোংলার পশুর নদীর জয়মনী থেকে মোড়েলগঞ্জের সন্ন্যাসী পর্যন্ত দীর্ঘ ৯৫ কিলোমিটার কোন বেড়িবাঁধ নেই। এসব এলাকায় চলাচলের জন্য সড়ক পথও তেমন উন্নত নয়। এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর মোংলার চাদপাই ইউনিয়নের কানাইনগর এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধে পাউবো অস্থায়ী ভিত্তিতে বেড়িবাধ নির্মাণ শুরু করলেও তা নিয়ে রয়েছে নানা দুর্ণীতি আর অনিয়মের অভিযোগ। এখানে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যায় কোন রকম দায়সারা ভেরীবাধ দিলেও তা দুই মাস মাথায় ভেঙ্গে নদীর সাথে বিলিন হয়ে যায়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া ভেরীবাধ নামে মাত্র দেয়া হয়েছে আর লুটপাট করেছে কর্মকর্তারা বলে ওখানকার এলাকাবসীর অভিযোগ।
স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। উন্নয়ন ও জনগণের জান মালের নিরাপত্তার জন্য উপকূলীয় জনপথে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে সরকার। কিন্তু নদীর সংলগ্ন হওয়া স্বত্বতেও কোন ইউনিয়নে স্থায়ী বেড়িবাঁধ হয়নি। একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর নদীর স্রোত,কুল ভাঙ্গা গড়ার খেলায় এ জনপদের বাসিন্দারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বছরের পর বছর ধরে বেড়িবাঁধ না থাকার দূভোর্গ চললেও জেলা,উপজেলা কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। ফলে প্রতি বছর বষার্ আর ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মৌসুমে পশুর নদীর পেটে বিলিন হচ্ছে বসতভিটা ও জনবসতি। লবণ পানি প্রবেশ করে ঘের ও পুকুর ভেসে কোটি কোটি টাকার মাছ ভেসে যায়। সামুদ্রিক ঘুর্নিঝড় সিড়র,আইলা,ফণি,বুলবুল পরবর্তী সর্বশেষ ছোবল হানা ঘুর্নিঝড় আম্পান এ জনপদের মানুষকে নিঃস্ব করেছে। প্রত্যেক বারই ঘুর্নিঝড় পরবর্তী নদীর তীরবর্তী এ জনপদ পত্যক্ষ ও পরিদর্শন করে থাকেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তা  ব্যক্তিরা ।
চাদপাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোল্ল্যা তারিকুল ইসলাম বলেন, যুগযুগ ধরে জোয়ার ভাটার সাথে তাল মিলিয়ে জীবন চলছে আমাদের। আমাদের এলাকার কয়েক হাজার মানুষ সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকে। নদী ও খালে একটু পানি বৃদ্ধি পেলেই ঘরের সামনে তলিয়ে যায়। নদী ও খালে লবণ পানি থাকায় ধান ও সবজি তেমন হয় না। প্রধান জীবিকার উৎস মাছের ঘেরও প্রতি বছর কয়েক বার ভেসে যায় প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানিতে। তিনি আরো বলেন, জলোচ্ছ্বাস এবং দুর্যোগের সময় এখানে ব্যাপকভাবে ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থায়ীভাবে এখানে যদি কিছু না করা হয় নদী ভাংগন থেতে এলাকা রক্ষা করা যাবে না। কাজেই এখানে স্থায়ী বেড়িবাধ একান্ত প্রয়োজন।
মোংলা উপজেলা নিবার্হী অফিসার কমলেশ মজুমদার জানান, পশুর নদীর তীরবতর্ী মানুষের নিরাপত্তায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কানাই নগর থেকে বড় একটি বাধ নির্মাণের পরিকল্পনার রয়েছে। আশা করি আগামি বছর নাগাদ এ বেড়ি বধ নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নাহিদুজ্জামান খাঁন বলেন, ছোট ছোট প্রকল্প দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা জাবেনা। তবে ৩৫/২ পোল্ডারের আওতায় মোংলার জয়মনির ঘোল থেকে রামপাল হয়ে মোরেলগঞ্জের সন্ন্যাসী পর্যন্ত প্রায় ৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করি প্রকল্পটি অনুমোদন হলে ওই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমবে।
সময় নিউজ২৪.কম/এমএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *